বুধবার, ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আড়াই হাজার কোটি টাকার CTCRP প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬ ৬:১১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

অভিযোগ প্রকাশের পরও বহাল তবিয়তে পিডি সাজ্জাদ কবির, প্রশ্নের মুখে প্রকল্পের স্বচ্ছতা। ফাইল ছবি

আড়াই হাজার কোটি টাকার উপকূলীয় শহর জলবায়ু সহিষ্ণু প্রকল্পে (CTCRP) অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে প্রথম পর্বের প্রতিবেদন প্রকাশের পরও কোনো দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি প্রকল্প পরিচালক সরকার মো. সাজ্জাদ কবিরের বিরুদ্ধে। বরং তিনি আগের মতোই স্বপদে বহাল থেকে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এতে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—অভিযোগের তদন্ত হবে, নাকি অভিযোগের আড়ালেই চলবে প্রকল্পের কার্যক্রম?

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন পাঁচ বছর মেয়াদি CTCRP প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালে। প্রকল্পটির লক্ষ্য উপকূলীয় এলাকার ৩২টি পৌরসভায় অবকাঠামো উন্নয়ন ও জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি। কিন্তু প্রকল্পের তিন বছর পেরিয়ে গেলেও বাস্তব অগ্রগতি মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এত বড় অর্থায়নের প্রকল্পে এমন ধীরগতির পাশাপাশি একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রে পিডি সাজ্জাদ কবির

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, প্রকল্প পরিচালক সরকার মো. সাজ্জাদ কবির দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্তে একটি প্রভাবশালী বলয়ের প্রভাব বেড়েছে। ওই বলয়ে প্রকল্প পরিচালক ছাড়াও উপ-প্রকল্প পরিচালক জুবাইদা আক্তার, মো. শাহজাহান ও উজ্জ্বল ত্রিপুরার নাম উঠে এসেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, নিয়োগ, কনসালট্যান্সি, ডিজাইন ও আর্থিক কার্যক্রমে একটি নির্দিষ্ট বলয়ের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই প্রয়োজন।

নিয়োগে পছন্দের লোক, ছাঁটাইয়ে অভিযোগ ঘুষের

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাজ্জাদ কবির প্রকল্পে দায়িত্ব নেওয়ার পর পূর্বে নিয়োগপ্রাপ্ত আউটসোর্সিং কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কনসালটেন্টদের একটি অংশকে বাদ দেওয়া হয়। পরে নতুন করে নিজেদের পছন্দের লোকজনকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব নিয়োগে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। তবে কার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে, কারা দিয়েছেন এবং কীভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে—এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

ডিজাইনার বাতিল, আউটসোর্সিংয়ে বাড়তি বিলের অভিযোগ

CTCRP প্রকল্পের আওতায় ৩২টি পৌরসভায় ৩৪টি আধুনিক মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের ডিপিপিতে ডিজাইনার নিয়োগের বিধান থাকলেও আগের প্রকল্প পরিচালকের সময়ে নিয়োগ দেওয়া ডিজাইনারদের দায়িত্ব গ্রহণের পর বাতিল করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরপর আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে তুলনামূলক কম ব্যয়ে ডিজাইনের কাজ করিয়ে সংশ্লিষ্ট খাতে অতিরিক্ত বিল দেখানোর সুযোগ তৈরি করা হয়েছে—এমন অভিযোগও করেছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

প্রশ্ন উঠেছে, ডিপিপিতে নির্ধারিত জনবল কাঠামো বা প্রক্রিয়া পরিবর্তন করা হয়ে থাকলে তার অনুমোদন কোথা থেকে নেওয়া হয়েছিল? ডিজাইনের মান যাচাইয়ের প্রক্রিয়াই বা কী ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকল্পের নথিপত্র পর্যালোচনা ও নিরপেক্ষ তদন্তেই স্পষ্ট হতে পারে।

বিদেশি টিম লিডার না এসেও লাখ লাখ টাকার বিল?

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে প্রকল্পের তিনটি কনসালট্যান্ট প্যাকেজ নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব প্যাকেজে তিনজন বিদেশি টিম লিডারের পদ রাখা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাংলাদেশে এনে কাজ না করিয়েই তাদের বেতন বাবদ বিপুল অর্থের বিল উত্তোলনের প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, বিদেশি টিম লিডাররা প্রকল্পে বাস্তবে কী পরিমাণ কাজ করেছেন, কোথায় ছিলেন, তাদের উপস্থিতি ও কর্মসম্পাদনের প্রমাণ কী—এসব প্রশ্নের যথাযথ জবাব প্রয়োজন।

যদি অভিযোগের সত্যতা থাকে, তাহলে এটি শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতার বিষয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

নিম্নমানের নির্মাণকাজের অভিযোগও সামনে

প্রকল্পের আওতাভুক্ত বিভিন্ন পৌরসভায় মার্কেট, সড়ক, ড্রেন ও শৌচাগার নির্মাণ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ, কোথাও কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন, আবার কোথাও আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বিশাল অঙ্কের অর্থের এই প্রকল্পে কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি, পরিমাপ, বিল যাচাই ও তৃতীয় পক্ষের কারিগরি মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব প্রক্রিয়ায় কোনো দুর্বলতা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অভিযোগের পরও ব্যবস্থা নেই কেন?

প্রথম দফায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রকল্প পরিচালক সাজ্জাদ কবিরকে ঘিরে নানা অভিযোগ সামনে আসার পরও এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তিনি এখনও প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে বহাল রয়েছেন।

এ অবস্থায় প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—অভিযোগগুলো তদন্তের আওতায় এসেছে কি না, এলে তদন্তের অগ্রগতি কতদূর, এবং তদন্ত শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে তদারকি করা হচ্ছে?

বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।

সামনে আরও নথি ও তথ্য

CTCRP প্রকল্পের নিয়োগ, কনসালট্যান্ট প্যাকেজ, ডিজাইন, বিল-ভাউচার, নির্মাণকাজের মান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে আরও নথি, তথ্য-উপাত্ত ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ধারাবাহিক প্রতিবেদনের পরবর্তী পর্বে এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হবে।

এদিকে, অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক সরকার মো. সাজ্জাদ কবির এবং সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে। অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাইও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের বিষয়।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।