কাজ ছাড়াই ২৩৫ কোটি টাকা বিল উত্তোলনের অভিযোগ, দুদকের অনুসন্ধানের খবরও প্রকাশিত—বদলি আদেশ বাতিল ঘিরে প্রশ্ন। ছবি : সংগৃহীত
নরসিংদী স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফুলকাম বাদশাহর বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন না করেই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা উত্তোলন ও আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলায় দক্ষিণাঞ্চলের আয়রন ব্রিজ পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের কথাও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যেই বর্তমানে তিনি নরসিংদী জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ফুলকাম বাদশাহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে কাজ না করেই বিল উত্তোলন, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, কমিশন বাণিজ্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অনিয়ম নিয়ে তদন্তের কথা থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ভান্ডারিয়ায় ২৩৫ কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ফুলকাম বাদশাহ একসময় পিরোজপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি দক্ষিণাঞ্চলের আয়রন ব্রিজ পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং প্রকল্প পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ওই প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন প্যাকেজের কাজ বাস্তবায়ন না করেই সরকারি অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
প্রকাশিত বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলায় ১২৫টি প্যাকেজসহ মোট ১২৮টি প্যাকেজের বিপরীতে কাজ না করেই বিলের মাধ্যমে ২৩৫ কোটি ৮৯ লাখ ১৮ হাজার ৩০০ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। এসব অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে প্রকল্পটির সাবেক পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী ফুলকাম বাদশাহকে ঘিরে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, ফুলকাম বাদশাহ ২০২১ সালের ৩০ মে থেকে ২০২৩ সালের ৩ জুলাই পর্যন্ত দক্ষিণাঞ্চলের আয়রন ব্রিজ পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের ৩ মে থেকে একই বছরের ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি প্রকল্পটির পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
দুদকের অনুসন্ধানের খবর, অবস্থান অনিশ্চিত
পিরোজপুরের কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ফুলকাম বাদশাহর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানের কথাও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে ওই অনুসন্ধানের বর্তমান অবস্থা কী, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়েছে কি না কিংবা অভিযোগের বিষয়ে দুদকের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত কী—এসব তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ফলে প্রকল্পের নথি, বিল-ভাউচার, পরিমাপ বই এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব কাজের সঙ্গে সরকারি অর্থ উত্তোলনের হিসাব মিলিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নথিপত্র যাচাই ও সরেজমিন তদন্ত ছাড়া অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হওয়া সম্ভব নয়।
নরসিংদীতেও কমিশন সিন্ডিকেটের অভিযোগ
এদিকে ফুলকাম বাদশাহ বর্তমানে নরসিংদী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে তাঁর নেতৃত্বে ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যের একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। বিভিন্ন উন্নয়নকাজে কমিশন আদায়ের মাধ্যমে তিনি আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি।
তবে নরসিংদীতে কমিশন বাণিজ্য কিংবা সিন্ডিকেট পরিচালনার এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বদলি আদেশ জারি, পরে বাতিল
ফুলকাম বাদশাহকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে তাঁর বদলি-সংক্রান্ত একটি ঘটনা। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সম্প্রতি নরসিংদী থেকে তাঁকে এলজিইডির সদরদপ্তরে বদলির জন্য প্রধান প্রকৌশলীর স্বাক্ষরে একটি আদেশ জারি করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ওই বদলি আদেশ বাতিল হয়ে যায়।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রভাবশালী মহলের সহায়তা ও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তিনি বদলি আদেশ বাতিল করিয়েছেন। যদিও এ অভিযোগেরও স্বাধীন সত্যতা পাওয়া যায়নি।
বদলি আদেশ বাতিলের ঘটনায় এলজিইডির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন—একজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এবং তদন্তের কথা থাকলে তিনি কীভাবে একই গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকছেন?
হুমায়ুন কবিরের বদলি নিয়েও প্রশ্ন
বদলি সংক্রান্ত আরেকটি ঘটনায় জানা গেছে, ২০২৬ সালের ৫ মে জারি করা একটি আদেশে হুমায়ুন কবিরকে নরসিংদীতে বদলি করা হয়েছিল। তবে তিনি সেখানে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে ওই বদলি আদেশও বাতিল হয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফুলকাম বাদশাহর নরসিংদীতে বহাল থাকা নিয়ে প্রশাসনিক দুর্বলতা, প্রভাব খাটানো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলজিইডির সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ।
তাঁদের মতে, বদলি আদেশ কেন বাতিল করা হলো, কার সুপারিশে তা বাতিল হয়েছে এবং এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব কাজ করেছে কি না—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।
সম্পদ ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও অভিযোগ
ফুলকাম বাদশাহর বিরুদ্ধে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের মনিপুর পাড়ায় ২ হাজার ১০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কেনার অভিযোগও রয়েছে। সরকারি ছুটির দিনগুলোতে সেখানে বিভিন্ন নারীর সঙ্গে সময় কাটিয়ে আমোদ-ফুর্তি করেন এবং বিভিন্ন রিসোর্টেও নারীদের নিয়ে সময় কাটান, এমন অভিযোগ করেছেন এলজিইডির কয়েকজন কর্মকর্তা।
তবে এসব ব্যক্তিগত অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি বা স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে যাচাইযোগ্য তথ্য হিসেবে নয়, অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, ফুলকাম বাদশাহ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে কাজ করেছেন। বিশেষ করে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য মিরাজ ও মহারাজের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কথা উল্লেখ করেছেন তাঁরা।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন এবং উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পান। তবে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ও এর মাধ্যমে কোনো অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
নথি যাচাই ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি
ফুলকাম বাদশাহর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি সরেজমিন পরিদর্শন, বিল-ভাউচার, পরিমাপ বই, ঠিকাদারি নথি এবং মাঠপর্যায়ের কাজের সঙ্গে সরকারি অর্থ উত্তোলনের হিসাব মিলিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন এলজিইডির কর্মকর্তাদের একটি অংশ।
তাঁদের মতে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ না করেই বিপুল অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা কেবল আর্থিক অনিয়ম নয়; সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির ক্ষেত্রেও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করবে। তাই অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
ফুলকাম বাদশাহর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
এখন বড় প্রশ্ন ২৩৫ কোটি টাকার হিসাব
সবশেষে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ভান্ডারিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের আয়রন ব্রিজ পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পে ১২৮টি প্যাকেজের বিপরীতে ২৩৫ কোটি ৮৯ লাখ ১৮ হাজার ৩০০ টাকা উত্তোলনের অভিযোগের প্রকৃত সত্য কী? বাস্তবে কতটুকু কাজ হয়েছে, কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং সরকারি অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে প্রকল্পের মূল নথি, মাঠপর্যায়ের বাস্তব কাজ এবং অর্থ উত্তোলনের হিসাবের নিরপেক্ষ যাচাইয়ের মাধ্যমে।
অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগও নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একটি অংশ।
