খাগড়াছড়ির সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তানিয়া। ছবি : সংগৃহীত
পিঠজুড়ে গভীর ক্ষত, পায়ে ধরেছে পচন। মাথায় সেলাইয়ের দাগ। গরম খুন্তি ও ইলেকট্রিক চুলায় ঝলসে দেওয়া হয়েছে শীর্ণ শরীর। বছরের পর বছর ধরে নির্যাতনের শিকার ১১ বছরের শিশু গৃহকর্মী তানিয়া এখন ঠিকমতো নড়াচড়াও করতে পারছে না। বর্তমানে সে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
মেয়েটি ভালো খাবে, ভালো থাকবে—এ আশায় খাগড়াছড়ি থেকে ঢাকার একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজে দিয়েছিলেন অসহায় বাবা বেলাল হোসেন। তাঁর ধারণা ছিল, ছোট্ট মেয়েটিকে কাজ করতে হলেও অন্তত দুবেলা খেতে পারবে, নিরাপদে থাকবে গৃহকর্তার বাসায়। কিন্তু সেই আশার বিপরীতে তানিয়ার কপালে জুটেছে দিনের পর দিন নির্মম নির্যাতন।
কান্নার শব্দ যাতে বাইরে না যায়, সেজন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকে বাথরুমে বন্দি করে রাখা হতো বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, গৃহকর্ত্রী মোর্শেদা আক্তার ছোটনের গ্রামের বাড়ি ফেনীতে। স্বামী-সন্তান নিয়ে তিনি ঢাকার কাফরুলের পূর্ব শেওড়াপাড়ায় থাকেন। মিরপুরের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন তিনি। তাঁর স্বামী মো. রাসেলের মিরপুরে একটি ল্যাপটপের দোকান রয়েছে। প্রায় দেড় বছর আগে তানিয়া ওই বাসায় গৃহকর্মীর কাজ শুরু করে। দীর্ঘদিন ধরে গৃহকর্ত্রী মোর্শেদা ও তাঁর মেয়ে শিশুটিকে নির্যাতন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘কাজ করলেও মারত, না করলেও মারত’
শিশুটির একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে তানিয়াকে বলতে শোনা যায়, ‘আমাকে বাসার সম্পূর্ণ কাজ করাইত। ঘর মোছা হইতে সব কাজ। আমারে বাথরুমে নিয়া দরজা বন্ধ কইরা রাখত। শুধু মারত। বাথরুম থেকে বের করার পরও বেটি (গৃহকর্ত্রী) আর তার মেয়ে মারত। কাজ করলেও মারত, না করলেও মারত। গরম খুন্তি হাতে-পায়ে-পিঠে চাইপা ধরত। ইলেকট্রিক চুলা দিয়েও ছ্যাঁকা দিত।
প্রায় এক মাস আগে মাথায় আঘাত করার কথাও জানায় তানিয়া। তার ভাষায়, এক মাস আগে গৃহকর্ত্রী মোর্শেদা তার মাথা ফাটিয়ে দেন।
বাবার ফোন এলেই বাথরুমে বন্দি
মেয়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য গৃহকর্ত্রী মোর্শেদার মোবাইল ফোনে কল দিতেন তানিয়ার বাবা বেলাল হোসেন। কিন্তু কথা বলতে না দিয়ে উল্টো ‘নাটক’ শুরু করতেন বলে অভিযোগ।
বেলালের ফোন থেকে কল গেলেই তানিয়াকে বাথরুমে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা আটকে রাখা হতো। এরপর মোর্শেদা জানাতেন, তানিয়া বাথরুমে গেছে।
তানিয়ার ভাষায়, ‘বাপে ফোন দিলে কইত, তানিয়া ওয়াশরুমে। আমি শুনতে পাইতাম। বাপেরে আমার লগে একদম কথা কইতে দিত না। দরজা ধাক্কাইয়া কইত, তানিয়া তোর বাপে কল দিছে। আবার বাপেরে কইত, তানিয়া ওয়াশরুমে, বের হইতে সময় লাগবে।’
নির্যাতনের শিকার মেয়েটির আকুতি, ‘বেটিকে আপনারা মারলে আমি শান্তি পাব। আমার ওপর যে নির্যাতন হইছে, তার বিচার চাই।
অভাবের সংসার থেকে ঢাকায়, ফিরল ক্ষত-বিক্ষত হয়ে
তানিয়াদের বাড়ি খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার আমতলী ইউনিয়নের করল্যাছড়ি গ্রামে। প্রায় পাঁচ বছর আগে তার মা মারা গেছেন। স্ত্রীকে হারানোর পর দুই মেয়েকে নিয়ে বেলালের সংসারে আরও অভাব নেমে আসে। তখন স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছিল তানিয়া।
দেড় বছর আগে দিনমজুর বাবা বেলাল মেয়েকে গৃহকর্মীর কাজে ঢাকায় পাঠান। তাঁর আশা ছিল, মেয়েটি অন্তত খাবার ও নিরাপদ আশ্রয় পাবে। কিন্তু যে আশায় তানিয়া বাড়ি ছেড়েছিল, তা পূরণ হয়নি। সুস্থ শরীরে বাসা ছেড়ে ঢাকায় এসে তাকে ফিরতে হয়েছে ক্ষত-বিক্ষত ও পোড়া শরীর নিয়ে।
জানা যায়, কয়েকদিন আগে মাথা ও থুতনিতে গুরুতর আঘাত করার পর তানিয়াকে ঢাকা থেকে এক স্বজনের মাধ্যমে ফেনীতে পাঠানো হয়। পরে তানিয়ার বাবাকে ফোন করে ফেনী থেকে মেয়েকে নিয়ে যেতে বলেন মোর্শেদা। বেলাল মেয়েকে নিয়ে শুক্রবার রাতে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন।
হাসপাতালের মেঝেতে তানিয়া, শরীরজুড়ে নির্যাতনের চিহ্ন
সরেজমিন খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, মেঝেতে শুয়ে আছে তানিয়া। তার চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ। ছোট্ট শরীরটির বিভিন্ন স্থানে পোড়া ও আঘাতের চিহ্ন। দীর্ঘদিনের অপুষ্টিতে শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকাও তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রিপল বাপ্পী চাকমা বলেন, ‘শিশুটির শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে। এসব ক্ষত দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের কারণে হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
মামলা কোথায় হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মামলা হয়নি। খাগড়াছড়ি সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিসবাহ উদ্দিন বলেন, ঘটনাস্থল ঢাকায়। এ কারণে তাঁর থানায় মামলা নেওয়ার সুযোগ নেই।
তবে খাগড়াছড়ি নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের পিপি অ্যাডভোকেট সৃজনী ত্রিপুরা বলেন, দেশের যে স্থানেই অপরাধ সংঘটিত হোক, খাগড়াছড়ি থানা মামলাটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করে ঢাকার সংশ্লিষ্ট থানাকে অবহিত করতে পারে।
কাফরুল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম সমকালকে জানান, সোমবার তিনি বিষয়টি শুনেছেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তাঁকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। মেয়েটির বাবার সঙ্গে গতকাল তিনি যোগাযোগ করে তাঁকে ঢাকায় আসতে বলেছেন।
গৃহকর্ত্রীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য নেওয়ার জন্য গৃহকর্ত্রী মোর্শেদা আক্তারের সঙ্গে গতকাল সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি স্কুলে আছেন জানিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি আর ফোন ধরেননি।
এদিকে, ১১ বছরের তানিয়ার চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং তার ওপর কথিত নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই নির্যাতনের অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের পাশাপাশি দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
