বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো সার্কেল-১-এর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ রুহুল আমিনকে ঘিরে অভিযোগের যেন শেষ নেই। গত বছর সিএনজি স্ক্র্যাপ সংক্রান্ত অনিয়মে জড়িতদের তালিকায় তাঁর নাম উঠে আসে। সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগও ওঠে। এত অভিযোগের পরও তিনি এখনো একই সার্কেলে বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
এবার নতুন করে তাঁর বিরুদ্ধে দালালদের ‘রামরাজ্য’ গড়ে তোলা এবং একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটকে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ উঠেছে।
দুই যুগ ধরে একই সার্কেলে
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা মেট্রো সার্কেল-১-এ প্রায় দুই যুগ ধরে কর্মরত রয়েছেন রুহুল আমিন। সাবেক হিসাবরক্ষক থেকে বর্তমানে তিনি সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন-পুরাতন লাইসেন্স, মালিকানা বদলি ও রুট পারমিটসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম তাঁর হাত দিয়েই সম্পন্ন হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
দীর্ঘ সময় একই সার্কেলে থাকার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ উঠলেও মিরপুর বিআরটিএতেই স্বপদে বহাল রয়েছেন তিনি। ফলে তাঁর দীর্ঘদিনের একই কর্মস্থলে থাকার নেপথ্যে প্রভাবশালী কোনো মহলের আশীর্বাদ রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নও উঠেছে।
রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাবের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান ও আওয়ামী লীগ নেতা নিক্সন চৌধুরীর আত্মীয় পরিচয় দিয়ে রুহুল আমিন প্রভাব খাটাতেন। এ কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও সংশ্লিষ্টদের অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পেতেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
দালাল সিন্ডিকেটের’ পেছনে রুহুল আমিন?
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বিআরটিএর কথিত দালাল সিন্ডিকেটের মূল হোতা মো. হারুন অর রশিদ রুবেলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে রুহুল আমিন কাজ করছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর সহযোগিতায় রুবেল গাড়ির মালিকানা বদলি, ফিটনেস, ট্যাক্স টোকেন ও রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত বিভিন্ন লেনদেন থেকে অর্থ আদায় করে শূন্য থেকে কয়েক কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।
রুবেলের ঢাকায় ফ্ল্যাট, গাড়িসহ নামে-বেনামে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ থাকার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব সম্পদের মালিকানা ও উৎস সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিআরটিএর পাশে ‘শাহরাস্তি বিজনেস সেন্টার’
জানা যায়, মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয়ের পাশে ‘শাহরাস্তি বিজনেস সেন্টার’ নামে একটি দোকান ভাড়া নিয়েছেন রুবেল। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা জমা নেওয়া হয় এবং ওই স্থানকে ঘিরেই সক্রিয় রয়েছে দালালদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
বিআরটিএতে দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনার পর প্রকাশ্যে দালালদের তৎপরতা কমে এলেও অভিযোগ রয়েছে, মিরপুরের বেশিরভাগ দালাল এখন ওই দোকানের আশপাশে অবস্থান করেন। সেখানে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লেনদেন হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
কাজ যায় রুবেলের কাছে, পৌঁছে রুহুল আমিনের টেবিলে?
অভিযোগ অনুসারে, বিআরটিএ কার্যালয়ের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার দালালরা তাদের কাজ রুবেলের কাছে জমা দেন। পরে রুবেলের ব্যক্তিগত সহকারী আব্দুল কাদেরের মাধ্যমে সেসব কাজ পৌঁছে যায় রুহুল আমিনের কাছে।
কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর একই প্রক্রিয়ায় তা আবার রুবেলের কাছে ফেরত পাঠানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে—অভিযানের পরও যদি দালালদের কার্যক্রম এভাবে পর্দার আড়ালে চলতে থাকে, তাহলে দালালবিরোধী অভিযান কতটা কার্যকর হচ্ছে?
‘ঝামেলাপূর্ণ’ কাজও সহজে সমাধানের অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআরটিএর এক কর্মকর্তা বলেন, অন্য সার্কেলের কর্মকর্তারা যেসব ঝামেলাপূর্ণ কাজ এড়িয়ে যান, রুহুল আমিন সেসব কাজও সহজে সমাধা করে ফেলেন।
তাঁর ভাষায়, তাঁর কাছে যেন এক ধরনের বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে।
এমন বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—কোন প্রক্রিয়ায় এসব জটিল কাজ দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং এর সঙ্গে কোনো অনৈতিক লেনদেন জড়িত কি না।
‘রুহুল আমিনদের’ খুঁটির জোর কোথায়?
প্রশ্ন উঠছে, এসব ‘রুহুল আমিনদের’ খুঁটির জোর কোথায়?
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রতিটি সরকারের আমলেই কিছু কর্মকর্তা বিআরটিএর মতো সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখেন এবং দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগ পান। মাঝেমধ্যে লোকদেখানো অভিযান হলেও অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা অনেক কর্মকর্তা থেকে যান আড়ালেই। আর তাঁদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েন সাধারণ সেবাগ্রহীতারা।
সিএনজি প্রতিস্থাপনেও পুরোনো অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, ২০০১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত সিএনজি প্রতিস্থাপনের নামে বিআরটিএর কিছু কর্মকর্তা ও মালিক সমিতির কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় রুহুল আমিন সহযোগী হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন, আদালতের রায় বা প্রমাণিত তথ্য এখানে উপস্থাপিত হয়নি। ফলে অভিযোগটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
জবাব মেলেনি রুহুল আমিনের
এসব অভিযোগের বিষয়ে রাজস্ব কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ রুহুল আমিনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
দীর্ঘ দুই দশক একই সার্কেলে দায়িত্ব পালন, পুরোনো ও নতুন অনিয়মের অভিযোগ, কথিত দালাল সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং গুরুত্বপূর্ণ সেবা কার্যক্রমে তাঁর প্রভাব—সব মিলিয়ে মিরপুর বিআরটিএতে রুহুল আমিনের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান ও কথিত ‘দালাল সাম্রাজ্য’ নিয়ে এখনই স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন ধরে থাকা কর্মকর্তাদের নিয়মিত বদলি নিশ্চিত করা গেলে বিআরটিএর সেবা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়তে পারে।
