ভুয়া বিল, কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি, বিভাগীয় শাস্তি—তবুও বহাল তবিয়তে দায়িত্বে! প্রশ্নের মুখে বিআরটিসির জবাবদিহিতা। ফাইল ছবি
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি)-তে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত বিভিন্ন অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগে আবারও আলোচনায় এসেছেন গাবতলী বাস ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের বর্তমান ইউনিট প্রধান এবং ম্যানেজার (টেকনিক্যাল) নায়েব আলী।
এটি ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্ব। প্রথম পর্বে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল। এবার উঠে এসেছে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়া, শাস্তি লঘু করা এবং একের পর এক অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার নতুন তথ্য।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও প্রশাসনিক তদবিরের মাধ্যমে নায়েব আলী বারবার শাস্তি এড়িয়ে গেছেন। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জোয়ারসাহারা ডিপো: মেরামত ছাড়াই বিল, পরে সাময়িক বরখাস্ত
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৬ সালে জোয়ারসাহারা বাস ডিপোর ম্যানেজার থাকাকালে বাস মেরামত না করেই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
ওই বছরের ৮ মে তৎকালীন মন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনে ৫৭৩৯, ৫৭৪১ ও ৫৩৮১ নম্বর বাস চলাচলের অনুপযোগী অবস্থায় পাওয়া যায়। ঘটনার পর কর্পোরেশনের আদেশ নং-৩৫.০৪.০০০০.০১১.০০.৪৬৬.৮৮৭ অনুযায়ী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই বরখাস্তাদেশ প্রত্যাহার করিয়ে পুনরায় দায়িত্বে ফিরে আসেন তিনি।
মতিঝিল ডিপোতে ৮ কোটির বেশি রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগ
নায়েব আলীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে মতিঝিল বাস ডিপোতে ম্যানেজার (অপারেশন) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে।
অভিযোগ অনুযায়ী, LoC-2 ঋণ প্রকল্পের আওতায় ভারত থেকে আমদানিকৃত ৩৫টি নতুন বাস সরকারি নির্ধারিত ভাড়ার পরিবর্তে অনুমোদনহীনভাবে কম ভাড়ায় পরিচালনা করা হয়।
এতে প্রতিদিন গড়ে ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৮৭ টাকা হারে কর্পোরেশনের মোট ৮ কোটি ২০ লাখ ৬২ হাজার ৬৮৩ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ।
বিআরটিসির অডিট বিভাগের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দায়িত্বে অবহেলার কারণে ১ কোটি ৭৭ লাখ ৪১ হাজার ৮০৭ টাকার সরাসরি রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
এই অভিযোগে ২০২০ সালের ১৩ অক্টোবর বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়।
শাস্তি কমানোর অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিভাগীয় মামলায় দুই বছরের বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের শাস্তি দেওয়া হলেও, তৎকালীন চেয়ারম্যানকে প্রভাবিত করে তা এক বছরে কমিয়ে আনেন নায়েব আলী।
অভিযোগকারীদের মতে, এই পুরো বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) স্বাধীন তদন্তের দাবি রাখে।
খুলনা ডিপোতেও অনিয়মের অভিযোগ
খুলনা বাস ডিপোতে ম্যানেজার (অপারেশন) থাকাকালেও তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
২০২২ সালের ২৪ নভেম্বর কর্পোরেশনের পত্র নং-২১০৯ অনুযায়ী ভুল তথ্য উপস্থাপন করে ৪ লাখ ৮৭ হাজার ১৯০ টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যয়ের অভিযোগে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করে সেই অভিযোগও ধামাচাপা দেওয়া হয় এবং কার্যকর কোনো শাস্তি হয়নি।
কেন পুনঃতদন্তের দাবি?
বিআরটিসির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতি, প্রশাসনিক অনিয়ম ও বিভাগীয় মামলার ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল রাখা হয়েছে।
তাদের মতে, বর্তমান সময়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করতে হলে অতীতের সব অভিযোগ পুনরায় তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
স্বাধীন তদন্তের দাবি জোরালো
সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, নায়েব আলীর বিরুদ্ধে—
অতীতের সব বিভাগীয় মামলার ফাইল পুনরায় খোলা,
আর্থিক অনিয়মের স্বাধীন তদন্ত,
রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতির হিসাব নিরূপণ,
প্রয়োজন হলে দুদকের অনুসন্ধান,
এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ
—এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
অভিযুক্তের মুঠোফোনে বক্তব্য জানতে একাধিক বার কল করলেও গ্রহণ করেননি। বার্তা পাঠানো হলেও কোনো রেসপন্স করছেন না।এ নিয়ে থাকবে পরবর্তী প্রতিবেদনে।
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো বিভিন্ন নথি, বিভাগীয় কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা নায়েব আলীর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
