গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগ-৫-এর একটি সরকারি টেন্ডারকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা। টেন্ডারের সব শর্ত পূরণ এবং প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার সনদ জমা দেওয়ার পরও একটি যৌথ উদ্যোগ (JV) প্রতিষ্ঠানকে Non-Responsive ঘোষণা করে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে Notification of Award (NOA) জারি করার অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী তামজিদ হোসেন-এর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হলেও তিনি এখন পর্যন্ত কোনো জবাব দেননি। শুধু আইনি নোটিশই নয়, সংবাদ প্রকাশের আগে সাংবাদিকদের বক্তব্য চাওয়ার পরও তার নীরবতা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশাসনিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে—এই নীরবতার আড়ালে কী রয়েছে?
গণমাধ্যমের হাতে আসা লিগ্যাল নোটিশ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা যায়, Baset Prokousholi Limited–Versatile Technology Ltd JV-এর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. সাজ্জাদ হোসেন পলাশ গত ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে আইনি নোটিশ পাঠান।
নোটিশে অভিযোগ করা হয়, টেন্ডার মূল্যায়নের সময় প্রতিষ্ঠানটির জমা দেওয়া Similar Nature Work Experience, Completion Certificate এবং Scope of Work যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। অথচ টেন্ডার নথিতে একই প্রকল্পের নাম নয়; বরং Similar Nature, Complexity and Construction Technology-এর কাজের অভিজ্ঞতাকেই যোগ্যতার ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
লিগ্যাল নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পূর্বে একটি অডিটোরিয়াম প্রকল্পে সফলভাবে ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল কাজ সম্পন্ন করেছে। সেখানে ইন্টারনাল ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্কস, স্টেজ লাইটিং, সাউন্ড সিস্টেম, এলইডি ডিসপ্লে, এয়ার কন্ডিশনিং এবং অ্যাকোস্টিক ওয়ার্কস-সহ একাধিক জটিল প্রযুক্তিনির্ভর কাজ সম্পন্ন হলেও মূল্যায়নের সময় সেই অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
নোটিশে দাবি করা হয়েছে, এ ধরনের মূল্যায়ন সরকারি ক্রয়বিধির স্বচ্ছতা, সমতা ও প্রতিযোগিতার মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই Non-Responsive ঘোষণার লিখিত কারণ জানানো, অভিজ্ঞতার সনদ পুনর্মূল্যায়ন এবং NOA-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে সতর্ক করা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (BPPA) Review Panel এবং প্রয়োজনে আদালতের শরণাপন্ন হওয়া হবে।
বক্তব্য চেয়েও মিলেনি কোনো জবাব
সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসরণ করে সংবাদ প্রকাশের আগে সমতল মাতৃভূমি-এর পক্ষ থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী তামজিদ হোসেনের কাছে লিখিতভাবে বক্তব্য চাওয়া হয়। অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা বা প্রাসঙ্গিক তথ্য উপস্থাপনের জন্য ০২ জুলাই ২০২৬, বিকেল ৫টা পর্যন্ত সময় দেওয়া হলেও তিনি কোনো লিখিত বা মৌখিক বক্তব্য দেননি। এমনকি অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করতেও আগ্রহ দেখাননি।
লিগ্যাল নোটিশের পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার এই নীরবতা প্রশাসনিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—অভিযোগের জবাব দিতে অনাগ্রহের কারণ কী? নাকি বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পরে আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানানো হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অমীমাংসিত।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে বাড়ছে বিতর্ক
সরকারি টেন্ডার মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, সমতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রশাসনিক দায়িত্ব। সংশ্লিষ্ট নথিতে উত্থাপিত অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয় নয়; বরং পুরো সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, জবাবদিহিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
এ কারণে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং প্রয়োজনে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
প্রকাশ থাকে যে, সংবাদ প্রকাশের আগে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। এমনকি আইনি নোটিশ পাওয়ার পরও কোনো জবাব দেননি।
নীরবতার আড়ালে কী লুকিয়ে আছে—তার উত্তর সময়ই দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য না পাওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
সমতল মাতৃভূমি বিষয়টির পরবর্তী অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। গণপূর্ত অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী বা অন্য কোনো পক্ষ পরবর্তীতে এ বিষয়ে বক্তব্য দিলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে… চলবে।
