মঙ্গলবার, ২১শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নথিজুড়ে জালিয়াতির অভিযোগ, ৪১ বছর পর ১২ কোটি টাকার প্লট হস্তান্তর করল রাজউক

স্টাফ রিপোর্টার
জুলাই ২০, ২০২৬ ২:২৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ব্যাংক রসিদ টেম্পারিং, মৃত মানুষের স্বাক্ষর, ভুয়া সনদ—কোটি টাকার সরকারি জমি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে তোলপাড়। ফাইল ছবি

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর নথিতে একের পর এক জালিয়াতির অভিযোগ। দীর্ঘ ৪১ বছর ধরে কার্যত অচল থাকা একটি প্লটের ফাইল হঠাৎ করেই সচল হয়ে যায়। এরপর নানা অনিয়ম, বিধি লঙ্ঘন ও প্রশ্নবিদ্ধ দাপ্তরিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত বর্তমান বাজারমূল্যে প্রায় ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকা মূল্যের একটি প্লট হস্তান্তর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগটি ঘিরে আলোচনায় এসেছে নিকুঞ্জ-২ আবাসিক এলাকার ২ নম্বর সড়কের ১৪ নম্বর প্লট। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ব্যাংক রসিদ টেম্পারিং, মৃত ব্যক্তির স্বাক্ষর ব্যবহার, ভুয়া অ্যাওয়ার্ড সনদ, জন্মসনদ নিয়ে প্রশ্ন, ওয়ারিশ সংক্রান্ত অসঙ্গতি এবং একাধিক সরকারি বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ।

লিখিত অভিযোগে রাজউকের চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম, সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) শেখ মতিয়ার রহমান এবং উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) মো. আসাদুজ্জামান বিশ্বাসের নাম উল্লেখ করে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সম্পৃক্ততার দাবি করা হয়েছে। অভিযোগটি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নথিপত্রে অসংখ্য অসঙ্গতি সামনে আসে।

কিস্তি পরিশোধ না করেও বহাল থাকল বরাদ্দ

রাজউকের নথি অনুযায়ী, ১৯৮৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ক্ষতিগ্রস্ত কোটায় প্লটটির বরাদ্দ পান আব্দুস সাত্তার। নিয়ম অনুযায়ী চার কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের কথা থাকলেও কেবল প্রথম কিস্তি পরিশোধ করা হয়। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ কিস্তি নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করা হয়নি।

অভিযোগ অনুযায়ী, চতুর্থ কিস্তি গ্রহণ করা হয় ২০২২ সালের ১৮ মে, অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের ৩৪ বছর পরে, যা বিদ্যমান বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর গত ৮ জানুয়ারি প্লটটির বরাদ্দ মমতাজ বেগম নামে পরিচয়দানকারী এক নারীর অনুকূলে বহাল করা হয়।

বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত সময় অতিক্রমের বহু আগেই বরাদ্দ বাতিল হয়ে জমিটি রাষ্ট্রের খাস সম্পত্তিতে পরিণত হওয়ার কথা ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যাংক রসিদে টেম্পারিংয়ের অভিযোগ

অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় কিস্তির টাকা জমা দেখাতে অন্য একজন বরাদ্দগ্রহীতার ব্যাংক রসিদের ফটোকপি ব্যবহার করে নাম ও প্লট নম্বর পরিবর্তন করা হয়েছে।

নথি অনুযায়ী, মনজুরুল হক নামে অপর এক ব্যক্তির প্লটের বিপরীতে জমা দেওয়া রসিদে টেম্পারিং করে সেখানে আব্দুস সাত্তারের নাম বসানো হয়েছে বলে অভিযোগ।

রাজউকের সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) শেখ মতিয়ার রহমানও বলেন, দ্বিতীয় ও তৃতীয় কিস্তির রসিদে ঘষামাজার বিষয়টি নজরে এসেছে এবং বিষয়টি তদন্ত করা হবে।

মৃত ব্যক্তির স্বাক্ষর, ভুয়া সনদ ও নথির অসঙ্গতি

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে—

ওয়ারিশদের হাজিরা শিটে এমন এক ব্যক্তির স্বাক্ষর রয়েছে, যিনি ওই হাজিরার বহু আগেই মারা গেছেন।

ওয়ারিশান সনদ ও জেলা প্রশাসকের অ্যাওয়ার্ড সনদ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

ব্যাংক স্টেটমেন্টে হিসাবের অমিল পাওয়া গেছে।

আমমোক্তারনামায় ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে কিস্তি পরিশোধের দাবি করা হলেও মূল বরাদ্দপত্র অনুযায়ী অর্থ জমা দেওয়ার কথা ছিল সোনালী ব্যাংকের ডিআইটি শাখায়।

এসব বিষয়ে নথিতে কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

একাধিক প্লটের তথ্য গোপনের অভিযোগ

রাজউকের নথিতেই উল্লেখ ছিল, মূল বরাদ্দগ্রহীতার নামে বারিধারাসহ অন্য এলাকায় প্লট রয়েছে। এমনকি তিনি নিজেও পূর্বে একটি আবেদনে অন্য প্লট পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

বিধি অনুযায়ী একই ব্যক্তি বা পরিবার একাধিক প্লট বহাল রাখতে পারেন না। অভিযোগে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এই তথ্য পরবর্তীতে নথি থেকে গুরুত্বহীন করে উপস্থাপন করা হয়।

মমতাজ বেগমের পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন

নিজেকে আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী দাবি করে আবেদনকারী মমতাজ বেগমের জন্মসনদ, ঠিকানা এবং পরিচয় নিয়ে নথিতেই গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

তৎকালীন পরিচালক (এস্টেট) এ বি এম এহছানুল মামুন তার নোটে উল্লেখ করেন, দাখিল করা জন্মসনদে অসঙ্গতি রয়েছে এবং স্থায়ী ঠিকানার তথ্যও পরস্পরবিরোধী।

অনিয়ম তুলে ধরার পর বদলি, এরপরই ‘সব ঠিক আছে’

অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন পরিচালক এ বি এম এহছানুল মামুন নথির অসঙ্গতি চিহ্নিত করে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের সুপারিশ করেন।

এর অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে এস্টেট বিভাগ থেকে বদলি করা হয়। পরে নতুন পরিচালক মিজানুর রহমান পূর্ববর্তী সব আপত্তি খারিজ করে নোটে লেখেন—‘সব ঠিক আছে, সদয় অনুমোদন দেওয়া যায়।’

অভিযোগে বলা হয়েছে, ব্যাংকের লিখিত যাচাই ছাড়াই মৌখিক তথ্যের ভিত্তিতে কিস্তি পরিশোধ সঠিক বলে উল্লেখ করা হয় এবং তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ছাড়াই বরাদ্দ বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ব্যাংকের বক্তব্য

সোনালী ব্যাংক পিএলসির ডিআইটি (বর্তমানে রাজউক ভবন) শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার এরশাদুল হক বলেন, ব্যাংক কখনো মৌখিকভাবে রসিদ যাচাই করে না। কোনো সংস্থা লিখিতভাবে জানতে চাইলে ব্যাংক লিখিতভাবেই তথ্য প্রদান করে।

রাজউকের বক্তব্য

রাজউকের সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) শেখ মতিয়ার রহমান বলেন, বিষয়টি এখন বিস্তারিতভাবে নজরে এসেছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম বলেন, আগের তদন্ত কমিটির বিষয়টি নথি থেকে বাদ পড়েছিল। বর্তমানে কারা জড়িত তা খুঁজে বের করতে নতুন তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মত

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর সভাপতি আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, এত দীর্ঘ সময় পর নিয়মবহির্ভূতভাবে প্লট বহাল রাখার উদ্যোগ অত্যন্ত সন্দেহজনক। আইন অনুযায়ী এ ধরনের বরাদ্দ বহু আগেই বাতিল হয়ে রাষ্ট্রের সম্পত্তিতে পরিণত হওয়ার কথা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জমান বলেন, যদি জালিয়াতির মাধ্যমে প্লটের অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকে, তবে এটি কোনোভাবেই বৈধ হতে পারে না। তিনি জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে অনুসন্ধানের আহ্বান জানান।

উল্লেখ্য যে , উপরে বর্ণিত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট নথি, লিখিত অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত অভিযোগ ও দাবি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে যথাযথ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত হবে, এটাই দাবি সংশ্লিষ্ট মহলসহ গোটা নেটিজেনদের।

এসব বিষয় আরো আপডেট তথ্য ও ব্যাখা পাওয়া গেলে বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ