বৃহস্পতিবার, ১৬ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পাসপোর্ট অফিসে সেবার বদলে সিন্ডিকেটের দাপট, দালাল ছাড়া যেন মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা

নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই ১৬, ২০২৬ ১২:১১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সরকারি সেবার আড়ালে অঘোষিত দালাল সাম্রাজ্য? যাত্রাবাড়ী, উত্তরা ও আফতাবনগরের সরেজমিন চিত্রে উঠে এলো উদ্বেগজনক অভিযোগ। ফাইল ফটো

ডিজিটাল সেবা ও স্মার্ট বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির এই সময়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবা—পাসপোর্ট প্রাপ্তি—নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। রাজধানীর একাধিক আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সরকারি নিয়মের পাশাপাশি যেন সমান্তরালভাবে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দালালচক্র। অভিযোগ অনুযায়ী, সাধারণ নাগরিক নিজ উদ্যোগে আবেদন করতে গেলে অযথা হয়রানি, একের পর এক কাগজপত্রের অজুহাত, আবেদন বাতিল এবং দীর্ঘ সময় অপেক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অথচ দালালের মাধ্যমে গেলে একই কাজ দ্রুত ও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হচ্ছে বলে দাবি করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, পাসপোর্ট অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং দালালচক্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী যোগসাজশ কাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সরকারি ফি ছাড়াও অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে জটিল আবেদনও সহজ হয়ে যায়, লাইনে দাঁড়াতে হয় না, এমনকি নির্ধারিত সময়ের আগেই পাসপোর্ট পাওয়ার ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয়।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, অফিসে কোনো দালালচক্রকে প্রশ্রয় দেওয়া হয় না এবং অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

যাত্রাবাড়ী পাসপোর্ট অফিস: গেটেই দালালের অভ্যর্থনা, ভেতরে সেবাপ্রত্যাশীদের ভোগান্তি

গত ১২ মে সকাল ১১টার দিকে যাত্রাবাড়ী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অফিসের মূল ফটকের দুই পাশে কয়েকজন যুবক অবস্থান নিয়ে অফিসে প্রবেশ করা প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে জানতে চাইছেন—কী কাজে এসেছেন? উত্তর পাওয়ার আগেই তারা সহযোগি আশ্বাস দিয়ে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা দালাল নন; আশপাশের কম্পিউটার দোকানের কর্মচারী। তবে সেবাপ্রত্যাশীদের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের অভিযোগ, আবেদনপত্র পূরণ থেকে ছবি তোলা, তথ্য সংশোধন, আবেদন জমা দেওয়া এবং পাসপোর্ট ডেলিভারি পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপেই দালালদের সক্রিয় প্রভাব রয়েছে।

একাধিক ভুক্তভোগী জানান, একই আবেদন নিজে জমা দিতে গেলে নানা অজুহাতে ফেরত দেওয়া হলেও দালালের মাধ্যমে জমা দিলে সহজেই গ্রহণ করা হয়।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কথা বলা এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে দালাল হিসেবে পরিচয় দেন, দাবি করেন—সাধারণ সমস্যার সমাধানে সরকারি ফির বাইরে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা, আর বয়স পরিবর্তন বা জটিল সংশোধনের ক্ষেত্রে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।

শ্যামপুরের এক ভুক্তভোগী জানান, বহুবার চেষ্টা করেও আবেদন জমা দিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত অফিসের সামনেই এক দালালকে দুই হাজার টাকা দেন। এরপর একই আবেদন অনায়াসে গ্রহণ করা হয়।

আরেক নারী অভিযোগ করেন, ছোট ভাইয়ের পাসপোর্ট করতে গিয়ে প্রয়োজনের বাইরে ব্যক্তিগত নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা তাকে বিব্রত করেছে।

যাত্রাবাড়ী পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক অরূপ রতন চাকী অবশ্য দাবি করেন, অফিসের ভেতরে কোনো দালালের অস্তিত্ব নেই; বাইরের বিষয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের আওতাধীন।

উত্তরা পাসপোর্ট অফিস: “আধা ঘণ্টায় সব কাজ”, বাড়তি টাকায় আগেই মিলবে পাসপোর্ট!

১৩ মে উত্তরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসেও একই ধরনের অভিযোগের চিত্র উঠে আসে।

অফিসে প্রবেশের পরপরই “হালিম” নামে পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি সব কাজ দ্রুত করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তার দাবি, ৮ হাজার টাকার বিনিময়ে কোনো সিরিয়াল ছাড়াই আবেদন জমা, ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব। নির্ধারিত সময়ের আগেই পাসপোর্ট হাতে পেতে চাইলে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে বলেও জানান তিনি।

নামের ভুল সংশোধনের বিষয়ে কথা বলতেই তিনি সরাসরি এক কর্মকর্তার সঙ্গে ফোনে কথা বলিয়ে দেন। পরে পাশের একটি কম্পিউটারের দোকানে নিয়ে গিয়ে দরকষাকষির মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রস্তাব দেন।

সেবাপ্রত্যাশী সিরাজুল ইসলাম অভিযোগ করেন, কখনও বিদ্যুৎ বিলের কপি, কখনও মূল কপি—এভাবে নানা অজুহাতে তাকে একাধিকবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে রিয়াদ ইবনে জাবেদ বলেন, কয়েক দফা ঘোরাঘুরির পর তিনি জানতে পারেন, অধিকাংশ মানুষ অতিরিক্ত টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমেই ঝামেলামুক্তভাবে পাসপোর্ট করছেন।

আফতাবনগর পাসপোর্ট অফিস: সমস্যাভেদে নির্ধারিত ‘রেট’, প্রকাশ্যেই দরকষাকষি

আফতাবনগর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসেও ভিন্ন কোনো চিত্র দেখা যায়নি।

অফিসের প্রবেশমুখেই কয়েকজন ব্যক্তি বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়ে সেবাপ্রত্যাশীদের কাছে ভিড় করছেন।

তাদের তথাকথিত “রেট কার্ড” অনুযায়ী—

. নামের বানান সংশোধন: ৩ হাজার টাকা

. ঠিকানা সংশোধন: আড়াই হাজার টাকা

. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকলেও অতিরিক্ত টাকায় সমাধান

. লাইনে না দাঁড়িয়ে আবেদন জমা: ২ হাজার টাকা

সরেজমিনে দেখা যায়, অফিস চত্বরে ১০ থেকে ১৫ জন ব্যক্তি প্রকাশ্যেই সেবাপ্রত্যাশীদের সঙ্গে দরদাম করছেন। পরে পাশের কম্পিউটারের দোকানে নিয়ে গিয়ে চূড়ান্ত হয় অর্থের পরিমাণ, এরপর ফাইল নিয়ে তারা সরাসরি অফিসে প্রবেশ করছেন।

ভুক্তভোগী রুবেল জানান, তার ভাইয়ের পাসপোর্টে বাবার নাম ভুল হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কার্যকর সমাধান না পেয়ে শেষ পর্যন্ত দালালের শরণাপন্ন হয়ে নতুন পাসপোর্ট করতে বাধ্য হয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে আফতাবনগর পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তাজ বিল্লাহ বলেন, পুরো অফিস এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় রয়েছে। কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

নাগরিক সেবার সামনে বড় প্রশ্ন

ডিজিটাল সেবা ও স্মার্ট প্রশাসনের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সময়ে যদি একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরে সাধারণ মানুষকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে দালালের দ্বারস্থ হতে হয়—তবে তা শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতার বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় জনসেবার প্রতি মানুষের আস্থার জন্যও বড় ধরনের সতর্কসংকেত।

যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবুও একাধিক ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা এবং সরেজমিন পর্যবেক্ষণে উঠে আসা অভিযোগগুলো বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার প্রশ্ন সামনে এনেছে।

সচেতন নাগরিকদের দাবি, পাসপোর্ট অফিসগুলোতে দালালচক্রের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, সেবাপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ নাগরিক যেন কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই নির্ধারিত নিয়মে পাসপোর্ট সেবা পান—তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।