ছবি সংগৃহীত
যুবদল নেতা হত্যা ও গুমের অভিযোগে দায়ের হওয়া দুইটি হত্যা মামলার আসামি থাকা অবস্থায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপ-কমিশনার মোহাম্মদ মাহবুব আলম খানকে ফেনীর পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে পদায়ন করাকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (৫ মে) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের পুলিশ-১ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে তাকে ফেনীর এসপি হিসেবে পদায়ন করা হয়। তবে এর পরদিনই বুধবার (৬ মে) তার এই পদায়ন বাতিল এবং তাকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত আবেদন করেন ভুক্তভোগী পরিবারের এক সদস্য।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দীর্ঘদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন, গুম, নির্যাতন ও কথিত বন্দুকযুদ্ধের নানা ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন মাহবুব আলম খান।
‘বন্দুকযুদ্ধের’ আড়ালে যুবদল নেতা হত্যা!
চাঞ্চল্যকর একটি মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২০১৭ সালের ২৭ এপ্রিল শিবগঞ্জ থানায় পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ইউনিয়ন যুবদলের কর্মী মিজানুর রহমান।
ঘটনার সাত বছর পর, ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিহতের বাবা আইনাল হক হত্যা মামলা দায়ের করেন। সেই মামলার ১০ নম্বর আসামি করা হয় মাহবুব আলম খানকে।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০১৬ সালের ১৭ আগস্ট ছাত্রদল নেতা সেতাউর রহমানকে ধরতে গিয়ে তাকে না পেয়ে তার ভাই মিজানুর রহমানকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। এরপর দীর্ঘ সময় তাকে আটকের বিষয়টি অস্বীকার করা হয়। পরিবার বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করলেও কোনো সুরাহা মেলেনি।
পরিবারের অভিযোগ, মিজানুরকে ছাড়িয়ে দেওয়ার নামে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ২০ লাখ টাকা দাবি করেন।
পরে নানা চেষ্টা করে ৯ লাখ টাকা দেওয়া হলেও বাকি অর্থের জন্য চাপ অব্যাহত থাকে।
এদিকে, ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর মিজানুরের আরেক ভাই রেজাউল করিমকেও রাজশাহী নগরী থেকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়। এরপর দুই ভাই দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকেন। পরে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বন্দুকযুদ্ধে মিজানুর নিহত হয়েছেন। তবে রেজাউল করিমের কোনো সন্ধান আজও মেলেনি।
গুম কমিশন ও ট্রাইব্যুনালের তদন্ত-সরকার পরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট সংবাদ সম্মেলন করে পরিবারটি আট বছর ধরে নিখোঁজ রেজাউল করিমের সন্ধান দাবি করে।
শুধু থানায় মামলা নয়, গুম কমিশনেও অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও গুম কমিশনের প্রতিনিধিরা গত ফেব্রুয়ারিতে ঘটনাটি তদন্তে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পরিদর্শন করেন।

আমাদের পরিবার ধ্বংস করে দিয়েছে-মাহবুব আলম খানের পদায়ন বাতিল চেয়ে আবেদনকারী এবং জেলা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সেতাউর রহমান বলেন—মাহবুব আলম খান চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় আট বছর ছিলেন। এমন কোনো অপরাধ নেই, যা তিনি করেননি। আমাদের পরিবার ধ্বংস করে দিয়েছেন। কত মায়ের বুক খালি করেছেন, তার হিসাব নেই। মামলা থাকার পরও কীভাবে তাকে এসপি করা হলো?
আরেক হত্যা মামলাতেও আসামি: ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর শিবগঞ্জ থানায় দায়ের হওয়া আরও একটি হত্যা মামলায় ১২ জনের মধ্যে তিন নম্বর আসামি করা হয় মাহবুব আলম খানকে। যদিও ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইমরান হোসেন জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে তার নাম বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এখনো জমা হয়নি।
যা বলছেন মাহবুব আলম খান-সব অভিযোগ অস্বীকার করে মাহবুব আলম খান বলেন—দুইটি হত্যা মামলার একটিতে ইতোমধ্যে আমাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অন্য মামলার ঘটনার সময় আমি ট্রেনিংয়ে ছিলাম। এ সংক্রান্ত প্রমাণও দিয়েছি। আশা করছি, ওই মামলাতেও অব্যাহতি পাব।
পুলিশ সদর দপ্তরের নীরবতা: এ বিষয়ে জানতে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে সদ্য যোগ দেওয়া ডিআইজি (এডমিন) আবু সালেহ রায়হান বলেন— আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। বিস্তারিত না জেনে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
মানবাধিকার আইনজীবীর প্রশ্ন: মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান বলেন—ফৌজদারি মামলায় জামিন না নিলে তিনি আইনগতভাবে পলাতক হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। এমন গুরুতর অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাকে জেলার এসপি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সরকারকে এ ধরনের পদায়নে আরও সতর্ক হওয়া উচিত।
