ফাইল ছবি
সরকারি প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আইয়ুব আলীকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, টেন্ডার বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দেশ-বিদেশে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহলে। সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঠিকাদার এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের সময় তিনি রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থেকে ড্রেজিং কার্যক্রম, ড্রেজার ক্রয়, যন্ত্রাংশ সংগ্রহ, বিল অনুমোদন এবং টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পরও তার প্রভাব পুরোপুরি কমেনি—এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন মহলে।
রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) সাইফুজ্জামান শিখরের আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন সংস্থার ভেতরে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। যদিও বিভিন্ন সূত্রের দাবি, সরাসরি নয় বরং পারিবারিকভাবে দূর সম্পর্ক থাকলেও তিনি এই পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার করতেন।
ফলে অনেক কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পেতেন—বদলি, হয়রানি কিংবা পদোন্নতি আটকে যাওয়ার আশঙ্কায়।
ড্রেজিং প্রকল্পে ‘৭০০ কোটি টাকার প্রশ্ন’
সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে ড্রেজিং প্রকল্পকে ঘিরে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সাধারণ ব্যয়ের তুলনায় আইয়ুব আলীর নিয়ন্ত্রণাধীন কিছু প্রকল্পে প্রতি ঘনমিটার ড্রেজিং খরচ অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ১৪০ লাখ ঘনমিটার মাটি অপসারণের নামে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা বিল দেওয়া হয়েছে, যার বড় অংশ অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়েছে।
অভিযোগকারীদের মতে, এই অতিরিক্ত অর্থের একটি অংশ নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালী মহলের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে।
নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ
বঙ্গ ড্রেজার্স লিমিটেড ও কর্ণফুলী ড্রেজিং লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আইয়ুব আলীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও রয়েছে নানা আলোচনা।
অভিযোগ উঠেছে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কারসাজি করে এসব প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হতো। কখনও দরপত্রের শর্ত এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে প্রতিযোগিতা সীমিত থাকে, আবার কখনও প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে যেসব অনিয়মের অভিযোগ
চট্টগ্রাম-ঢাকা নৌপথ উন্নয়ন, বরিশাল অঞ্চলের নদী খনন, বিভিন্ন আঞ্চলিক রুটে ড্রেজিং এবং টার্মিনাল নির্মাণসহ একাধিক প্রকল্পে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগগুলো হলো—
• প্রকল্পের বাস্তব প্রয়োজন যাচাই ছাড়াই অনুমোদন
• অতিরিক্ত ব্যয় নির্ধারণ
• নিম্নমানের কাজের বিল পরিশোধ
• কাজের অগ্রগতি কম হলেও দ্রুত বিল ছাড়
শ্মশানঘাট টার্মিনাল থেকে বিদেশে সম্পদের অভিযোগ
শ্মশানঘাট টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প নিয়েই সবচেয়ে বেশি সমালোচনা শোনা যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিদ্যমান টার্মিনালগুলো পুরোপুরি ব্যবহার না হলেও নতুন টার্মিনাল নির্মাণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। প্রতিটি পল্টুনের মূল্য বাজারদরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জনস্বার্থের চেয়ে কমিশনভিত্তিক সিদ্ধান্তই এখানে প্রাধান্য পেয়েছে।
জলযান ক্রয়ে ‘হাজার কোটি টাকার প্রশ্ন’
ড্রেজার ও আনুষঙ্গিক জলযান ক্রয় প্রকল্পেও উঠেছে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ।
কয়েক হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পে ড্রেজার, টাগ বোট, হাউজ বোট, সার্ভে ভেসেল, পাইপলাইনসহ নানা সরঞ্জাম কেনা হলেও এর একটি অংশ ছিল নিম্নমানের, অকার্যকর কিংবা প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত—এমন দাবি সংশ্লিষ্টদের।
অভিযোগ রয়েছে—
• কিছু ড্রেজার অল্প সময়েই বিকল হয়ে পড়ে
• কিছু জলযান দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে
• কাগজে দেখানো পাইপলাইনের বাস্তব অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে
• নিয়মনীতি উপেক্ষা করে বিল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে
বিরোধ থেকে উত্তেজনা, দপ্তরে অশান্তি
অভিযোগ রয়েছে, একই কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একাধিক পক্ষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত পছন্দের একজনকে কাজ দেওয়া হতো।
এতে ক্ষুব্ধ ঠিকাদাররা দপ্তরে গিয়ে টাকা ফেরত দাবি করেন এবং এক পর্যায়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এমনকি তাকে মারধরের ঘটনাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানা গেছে। তবে এসব ঘটনার স্বাধীন যাচাই এই প্রতিবেদনের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল—সম্পদের বিস্তার
দুর্নীতির অর্থে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগও কম নয়।
বিভিন্ন অভিযোগপত্রে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, জমি, খামার ও বাণিজ্যিক বিনিয়োগের তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
বসুন্ধরা, বারিধারা ডিওএইচএস, ধানমণ্ডি, জিগাতলা, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, আশুলিয়া, পূর্বাচল, আফতাবনগর, মিরপুর, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও সাভার এলাকায় তার বা পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী—
• বসুন্ধরায় বহুতল ভবন নির্মাণাধীন
• ধানমণ্ডি ও বারিধারায় একাধিক ফ্ল্যাট
• আশুলিয়া ও পূর্বাচলে প্লট
• আফতাবনগরে জমি
এসব সম্পদের বেশিরভাগই স্ত্রী, সন্তান বা আত্মীয়স্বজনের নামে কেনা হয়েছে—এমন দাবিও করেছেন অভিযোগকারীরা।
গ্রামে খামার, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট
শুধু শহর নয়, গ্রামাঞ্চলেও বিস্তৃত বিনিয়োগের অভিযোগ রয়েছে।
সাভারে গরুর খামার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মুরগির খামার ও বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, যশোর অঞ্চলে কৃষিজমি ও মাছের ঘের—এমন নানা সম্পদের তথ্য বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে।
বিদেশে সম্পদ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর দিক হলো বিদেশে সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচার।
বিভিন্ন সূত্রের দাবি—
• ২০২১ সালে লন্ডনে বাড়ি
• ২০২৩ সালে নিউইয়র্কে সম্পদ
• অস্ট্রেলিয়ায় ছেলেদের নামে বাড়ি
• বিদেশি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর ও কমিশনের টাকা পাচারের অভিযোগ
তবে এসব তথ্যের স্বাধীন যাচাই বা আনুষ্ঠানিক প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
প্রশ্নের মুখে আভিজাত্যপূর্ণ জীবনযাপন
সমালোচকদের প্রশ্ন—সরকারি চাকরির বেতন-ভাতা দিয়ে কীভাবে এত বিপুল সম্পদ, একাধিক গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ ও বিলাসী জীবনযাপন সম্ভব?
তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক অভিযোগ জমা পড়লেও সেগুলোর অগ্রগতি স্পষ্ট নয় বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে অনেক অভিযোগে অগ্রগতি হয়নি—এমন কথাও শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন মহলে।
অভিযোগ অস্বীকার
আইয়ুব আলী অতীতে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।
নিজেকে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা দাবি করে তিনি অভিযোগগুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেছেন।
এসব অনিয়মের বিষয়ে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের নীরবতার প্রশ্নে আইয়ুব আলী বলেন, “এ প্রকল্পের অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত হয়েছে। কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি। আপনারা নিউজ করলে কিছু হবে না।”
তবে সবাইকে কীভাবে ম্যানেজ করলেন?—এমন প্রশ্নের জবাব তিনি এড়িয়ে যান বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তাদের মতে, তার কথাবার্তায় কৌশলী আচরণের ইঙ্গিত ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মত
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিআইডব্লিউটিএর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে এমন অভিযোগ চলতে থাকলে তা রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি ও জনসেবায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
স্বচ্ছ তদন্তের দাবি
সংশ্লিষ্টদের জোর দাবি—
• নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত• দেশ-বিদেশে সম্পদের অনুসন্ধান• প্রকল্প ব্যয় ও টেন্ডার প্রক্রিয়ার যাচাই• জড়িত কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা
বিআইডব্লিউটিএর ভেতরের অনেকেই মনে করছেন, শুধু একজন ব্যক্তিকে সরিয়ে নয়, পুরো সিস্টেমকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট সংস্কৃতি, অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাব কাটাতে না পারলে সংকট থেকেই যাবে।
আইয়ুব আলীকে ঘিরে ওঠা এই বিস্তর অভিযোগ এখন কেবল একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে।
চলবে……..
