পটুয়াখালীর উপকূলীয় দশমিনা উপজেলায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জলজ প্রাণী, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করেছে বন বিভাগ। টানা তিন দিনের বিশেষ অভিযানে চরহাদী ও চর হায়দার ফরেস্ট ক্যাম্পের আওতাধীন বিভিন্ন খাল থেকে ছোট-বড় মোট ১৬টি অবৈধ বাঁধ অপসারণ করা হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে বাধাগ্রস্ত খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার হয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার, বুধবার ও বৃহস্পতিবার দশমিনা উপজেলার চরহাদী এবং চর হায়দার ফরেস্ট ক্যাম্পের উদ্যোগে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অভ্যন্তর ও সংলগ্ন খালগুলোতে নিয়মিত টহল ও নজরদারি চালানো হয়। এ সময় বিভিন্ন খালে অবৈধভাবে নির্মিত একাধিক বাঁধের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়। পরে অভিযান চালিয়ে এসব বাঁধ কেটে অপসারণ করা হয়।
চরহাদী ফরেস্ট ক্যাম্পের আওতাধীন লালচর, কাউয়ার চর ও মাঝের চর এলাকায় বড় তিনটি বাঁধ এবং শাখা খালের ছোট ছয়টি বাঁধসহ মোট ৯টি অবৈধ বাঁধ অপসারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, চর হায়দার ফরেস্ট ক্যাম্পের আওতায় চর হায়দার ও চর আজমাইন এলাকার বনাঞ্চল থেকে বড় তিনটি বাঁধ এবং শাখা খালের ছোট চারটি বাঁধসহ মোট ৭টি অবৈধ বাঁধ অপসারণ করা হয়।
দুই ক্যাম্পের আওতায় মোট ১৬টি অবৈধ বাঁধ অপসারণের ফলে খালের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে, যা বনাঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাছ আহরণের নামে পরিবেশের জন্য হুমকি
উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে মাছ আহরণের উদ্দেশ্যে এসব বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। বাঁধগুলোর কারণে খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। এতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জলজ প্রাণী, মৎস্যসম্পদ এবং বনাঞ্চলের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
চরহাদী ফরেস্ট ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, এসব বাঁধ নতুন নয়; প্রায় পাঁচ থেকে সাত বছর আগে স্থানীয়ভাবে মাছ ধরার উদ্দেশ্যে এগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। সাধারণত প্রতি বছর শীত মৌসুম শেষে স্থানীয়রা মাছ ধরার কার্যক্রম শেষ করে বাঁধগুলো অপসারণ করে দেয়। কিন্তু বর্ষা মৌসুম শুরু হলে পুনরায় একই স্থানে বাঁধ নির্মাণের প্রবণতা দেখা যায়, যা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জন্য উদ্বেগজনক।
বাস্তুতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোফরেস্ট্রি বিভাগ ও ক্লাইমেট-স্মার্ট এগ্রিকালচার বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ড. মো. আলমগীর কবির বলেন, উপকূলীয় বনাঞ্চলের খালগুলো জোয়ার-ভাটার পানির স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজনন ও বিচরণের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। এসব খালে অবৈধ বাঁধ নির্মাণের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে পুরো বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা
দশমিনা রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, অবৈধ বাঁধ অপসারণ অভিযানের সময় ঘটনাস্থলের স্থিরচিত্র সংরক্ষণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অবৈধ বাঁধ নির্মাণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন,“সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বন বিভাগের নিয়মিত টহল, নজরদারি ও প্রয়োজনীয় অভিযান অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে বন ও জলজ সম্পদ সংরক্ষণে সচেতন করা হচ্ছে এবং অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রকৃতির জন্য স্বস্তির বার্তা
উপকূলীয় বনাঞ্চলের খালগুলো আবারও প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। অবৈধ বাঁধ অপসারণের ফলে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে আসায় মাছ, কাঁকড়া, চিংড়িসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর প্রাকৃতিক আবাসস্থল পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বন বিভাগের এই অভিযান স্থানীয় পরিবেশ সংরক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
