ফাইল ছবি
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর বন্দর ও পরিবহন বিভাগের পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন ওরফে আরিফ হাসনাতকে ঘিরে ব্যাপক দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং প্রশাসনিক অনিয়মের একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিগত সরকারের আমলে প্রভাবশালী অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন এবং প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি ক্ষমতাসীন মহলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে নিজের অবস্থান সুসংহত করেন। সরকার পরিবর্তনের পরও তিনি নিজের প্রভাব অক্ষুণ্ন রেখে আগের মতোই সুবিধা ভোগ করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
দুদকের অনুসন্ধান: নথিপত্র তলব
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপ-পরিচালক মো. হাফিজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত স্মারক নং-০০.০১.২৬০০.৬০৩.০১.২৩৪.২৩-৩২১৭, তারিখ ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ অনুযায়ী বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (প্রশাসন)-এর কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়।
ওই চিঠিতে আরিফ হাসনাতের বিরুদ্ধে নানাবিধ দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অনুসন্ধানের স্বার্থে বিভিন্ন নথিপত্র চাওয়া হয় বলে জানা গেছে।
দুদকের চাহিদাপত্রে নারায়ণগঞ্জ পোর্ট এবং সদরঘাট পোর্টের নির্দিষ্ট সময়ের ব্যাংক হিসাবের বিবরণ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নথি, চাকরিজীবনের শুরু থেকে জুন ২০২৩ পর্যন্ত বেতন-ভাতা সংক্রান্ত তথ্য, দায়িত্বসংক্রান্ত অফিস আদেশ এবং তার স্ত্রী, সন্তান ও ভাইদের নামে ব্যবসা বা শেয়ার পরিচালনার অনুমোদনসংক্রান্ত কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, আরিফ হাসনাত অবৈধ আয়ের অর্থে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে একটি বহুতল ভবন ক্রয় করেছেন। এছাড়া বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, পাবনা জেলায় বিপুল পরিমাণ জমি এবং দেশ-বিদেশে বিভিন্ন স্থাবর সম্পদের মালিকানা রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া একাধিক বেসরকারি ব্যাংকে বিপুল অঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিট, সরকারি সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার এবং পদমর্যাদার বাইরে বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত এখনো সম্পন্ন হয়নি এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আইন ও এস্টেট পরিচালক পদ নিয়ে প্রশ্ন
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং-১৮.০০.০০০০.০১৯.১৮.০১৩.২১-২৯৫, তারিখ ২৬ ডিসেম্বর ২০২৩ এবং পরবর্তী স্মারক নং-১৮.০০.০০০০.০১৯.১৮.০১৩.২১.১০৩, তারিখ ১৫ এপ্রিল ২০২৪ অনুযায়ী বিআইডব্লিউটিএর সাংগঠনিক কাঠামোয় এস্টেট ও আইন বিভাগের পদ সৃষ্টির বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে অর্থ বিভাগের আপত্তি ও সীমিত সম্মতির বিষয় উঠে এসেছে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে পরিচালক পর্যায়ের সুবিধা ভোগ করা হচ্ছে এবং এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না।
ব্যক্তিগত আচরণ নিয়েও নতুন অভিযোগ
পরিচালক আরিফ হাসনাতের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত জীবন ও আচরণ সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগের পাশাপাশি নতুন একটি অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মোহাম্মদপুর এলাকার এক নারীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের একটি ভিডিও ফুটেজ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
তবে ভিডিওটির সত্যতা, ধারণের সময়, স্থান ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিকতা সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, ভিডিও বা ডিজিটাল কনটেন্টের সত্যতা যাচাই ছাড়া এ ধরনের উপাদানকে প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। ফলে বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অভিযোগ অস্বীকার
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে পরিচালক আরিফ হাসনাত তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
বিআইডব্লিউটিএ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল ও দুর্নীতিবিরোধী কর্মীরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জনস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুতর অনিয়মের বিষয় সামনে আসতে পারে।
অন্যদিকে অভিযোগগুলো মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নাম পরিষ্কার করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখন সংশ্লিষ্টদের নজর দুদক ও সরকারের তদন্তকারী সংস্থাগুলোর দিকে। অনুসন্ধানের ফলাফলই নির্ধারণ করবে আলোচিত এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা।
