রবিবার, ২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বদলি ও অবসরের মাধ্যমে পার পাওয়ার সুযোগ নেই অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের, দুদকে অভিযোগের প্রস্তুতি 

ময়মনসিংহ জেলা প্রতিনিধি
আগস্ট ১, ২০২৬ ৫:৫২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

এলজিইডি ময়মনসিংহে ‘৩% কমিশন বাণিজ্য’ অভিযোগ: তিন মাসেও নেই দৃশ্যমান তদন্ত, প্রশ্নের মুখে প্রশাসনিক নীরবতা। ফাইল ফটো

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়কে ঘিরে কথিত ‘৩% কমিশন বাণিজ্য’, প্রকল্প পরিদর্শনে অনিয়ম এবং নথি জালিয়াতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর বিভাগীয় তদন্ত কিংবা দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, অডিও রেকর্ড ও বিভিন্ন নথিপত্র প্রকাশের পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

গত ৩০ এপ্রিল জাতীয় দৈনিক ‘আমার প্রাণের বাংলাদেশ’ এবং সমতল মাতৃভূমি’র অনলাইন পোর্টালে একাধিক গণমাধ্যমে নিউজ প্রকাশিত হয়েছে, এলজিইডি ময়মনসিংহে বিল বাণিজ্যের অভিযোগ: কমিশন, সাইট অনিয়ম ও নীরবতার সংস্কৃতি—উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ দাবি” শীর্ষক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে অডিও রেকর্ড, বিলসংক্রান্ত গোপন নথিপত্র এবং একাধিক ভুক্তভোগী ঠিকাদারের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান তদন্ত বা প্রশাসনিক পদক্ষেপের তথ্য সামনে আসেনি। ওই প্রকল্পের পিডি সিরাজুল ইসলাম এর দায় এড়াতে পারেন না। বক্তব্য জানতে চাইলেও ফোনকল গ্রহণ করেননি। এনিয়ে বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে।

‘৩% পার্সেন্টেজ’ কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ এলজিইডি কার্যালয়ে উন্নয়ন ও মেরামত প্রকল্পের বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে কথিত ‘৩% পার্সেন্টেজ’ আদায়ের একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া চালু ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের দাবি, নির্ধারিত কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানালে নানা প্রশাসনিক জটিলতার অজুহাতে বিল আটকে রাখা হতো, অডিটের কারণ দেখিয়ে ফাইল ঝুলিয়ে রাখা হতো এবং অযথা হয়রানির শিকার হতে হতো।

তথ্যপ্রমাণে আরও অভিযোগ করা হয়, তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী সালমান রহমান রাসেল-এর নির্দেশে তৎকালীন হিসাবরক্ষক শহিদুল ইসলাম বিল ছাড়ের আগে নগদ অর্থ সংগ্রহ করতেন। পরে সেই অর্থ কার্যালয়ের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় বণ্টন করা হতো বলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

সাইট পরিদর্শন, NOA ও চুক্তিপত্রে অনিয়মের অভিযোগ

প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তদারকির ক্ষেত্রেও একাধিক অনিয়মের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা। তাদের অভিযোগ—

সরেজমিনে প্রকল্পে উপস্থিত না হয়েই কার্যালয়ে বসে ইতিবাচক পরিদর্শন প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হতো।

নির্ধারিত উৎকোচ না দিলে কাজ সন্তোষজনক হলেও নেতিবাচক প্রতিবেদন দিয়ে ঠিকাদারদের হয়রানি করা হতো।

নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (NOA) প্রদান ও চুক্তিপত্র সম্পাদনের বিভিন্ন ধাপে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হতো।

সরকারি রোলারসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ না দিলে ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করা হতো।

তদন্ত হয়নি, অবসরের পর দায় এড়ানোর বক্তব্য?

প্রতিবেদন প্রকাশের পরও প্রায় দুই মাস দায়িত্বে বহাল থাকা অবস্থায় কোনো তদন্ত কমিটি গঠন বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেননি তৎকালীন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবিএম নাজমুল করিম। পরে গত ২৯ জুন তিনি অবসরে যান।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অবসরপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তা বলেন, আমি এখন দায়িত্বে নেই।

৩০ এপ্রিল থেকে ২৯ জুন পর্যন্ত দায়িত্বে থেকেও কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি আমার নজরে আসেনি।

পুনরায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট অফিসে এ ধরনের কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি হয় না। এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং পরবর্তীতে আর কোনো কল রিসিভ করেননি।

বদলি বা অবসরেই কি শেষ দায়বদ্ধতা?

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী সালমান রহমান রাসেল বর্তমানে অন্যত্র বদলি হয়েছেন। অন্যদিকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবিএম নাজমুল করিম এবং সাবেক হিসাবরক্ষক শহিদুল ইসলাম অবসরে গেছেন।

এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন—বদলি বা অবসরে গেলেই কি সরকারি দায়িত্ব পালনকালে ওঠা গুরুতর অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি মিলবে? সরকারি অর্থ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

নতুন নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রতিক্রিয়া

গত ১৬ জুলাই ময়মনসিংহে নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন হুমায়ুন কবির। দায়িত্ব গ্রহণের পর পূর্বের অভিযোগ ও নথিপত্র সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানেন না বলে তিনি জানান।

অন্যদিকে এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (SE) নাঈমা নাজনীন নাজ এ প্রতিবেদককে বলেন, পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে।

দুদকের হস্তক্ষেপ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সেখানে প্রশাসনিক চাপ, ভয়ভীতি ও হয়রানির একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। অনিয়মের প্রতিবাদ করলে লাইসেন্স বাতিল কিংবা বিল আটকে দেওয়ার ভয় দেখানো হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনায় এমন অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত না হলে রাষ্ট্রীয় অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই কেবল বদলি বা অবসরের মাধ্যমে দায় এড়ানোর সুযোগ না রেখে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
সারাবাংলা সর্বশেষ