ব্ল্যাংক চেক, লিখিত অঙ্গীকারনামা ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অভিযোগে প্রশ্নের মুখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুশাসন। ফাইল ছবি
দেশের আর্থিক খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা, মুদ্রানীতি প্রণয়ন, আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিতকরণ এবং জনগণের আমানতের নিরাপত্তা বিধানে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তাকে ঘিরে ওঠা বিস্ময়কর কিছু অভিযোগ আর্থিক খাতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (গবেষণা) ড. মো. গোলজারে নবী। অভিযোগকারীদের দাবি, একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ বা পদায়নকে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে ৪২ কোটি টাকার একটি গোপন আর্থিক চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। যদিও এ অভিযোগের সত্যতা এখনো কোনো সরকারি তদন্ত বা আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি।
অভিযোগের সূত্রপাত যেভাবে
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, ড. গোলজারে নবী সংশ্লিষ্ট উচ্চপদে দায়িত্ব গ্রহণের আগে একটি লিখিত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিপুল অঙ্কের অর্থ পরিশোধের অঙ্গীকার ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই চুক্তি অনুযায়ী দুই বছরের মধ্যে সুদে-আসলে মোট ৪২ কোটি টাকা পরিশোধের শর্ত উল্লেখ ছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, এই অর্থ কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির অংশ ছিল।
তবে অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট নথির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ব্ল্যাংক চেকের অভিযোগ
অভিযোগের আরও একটি আলোচিত অংশ হলো কথিত ‘ফাইন্যান্সিয়াল গ্যারান্টি’।
অভিযোগকারীদের দাবি, চুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ছয়টি স্বাক্ষরিত ব্ল্যাংক চেক সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল। এসব চেকে স্বাক্ষর থাকলেও অর্থের পরিমাণ ও অন্যান্য তথ্য ফাঁকা রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন নয়; বরং ব্যাংকিং আইন, আর্থিক শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক আচরণবিধির গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
৪২ কোটি টাকার উৎস নিয়ে প্রশ্ন
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, কোনো সরকারি বা আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তার নিয়মিত বেতন-ভাতা ও বৈধ আয় বিবেচনায় দুই বছরে ৪২ কোটি টাকা পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে।
তাদের মতে, এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস, সম্ভাব্য আর্থিক নেটওয়ার্ক এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা খতিয়ে দেখা জরুরি। কারণ অভিযোগ সত্য হলে এর সঙ্গে বৃহত্তর আর্থিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার বিষয়ও সামনে আসতে পারে।
তবে এসব বিষয় এখনো অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে এবং কোনো তদন্ত সংস্থা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত দেয়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাবমূর্তির প্রশ্ন
বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উঠলে তা দেশের ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তি ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ব্যাংক তদারকি এবং অর্থপাচার প্রতিরোধে কাজ করে আসছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির কোনো গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাকে ঘিরে ওঠা বিতর্ক স্বাভাবিকভাবেই জনমনে উদ্বেগ তৈরি করে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (গবেষণা) ড. গোলজারে নবীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট কোনো তদন্ত সংস্থা বা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
দীর্ঘ কর্মজীবনের অধিকারী ড. গোলজারে নবী
ড. মো. গোলজারে নবী ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগে সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যোগদানের আগে তিনি আইএফআইসি ব্যাংকে প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি গবেষণা বিভাগ, মনিটারি পলিসি বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমি এবং চিফ ইকোনমিস্ট ইউনিটসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তদন্তই দিতে পারে প্রকৃত উত্তর
বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগ যত গুরুতরই হোক না কেন, প্রমাণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। একইভাবে অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ার আগেও প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত।
তাদের মতে, অভিযোগে উল্লিখিত কথিত চুক্তিপত্র, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, ব্যাংক হিসাব, চেক সংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করে তদন্ত করা হলে প্রকৃত সত্য উদঘাটন সম্ভব হবে।
বর্তমানে পুরো বিষয়টি অভিযোগ ও অস্বীকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। কোনো আদালত, দুদক কিংবা সরকারি তদন্ত সংস্থা এখনো ড. গোলজারে নবীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ প্রমাণিত বলে ঘোষণা করেনি।
সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, দেশের আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ও জনআস্থা অটুট রাখতে এ ধরনের অভিযোগ দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। :::
