বৃহস্পতিবার, ২৫শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিআরটিসিতে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ সিন্ডিকেটের অভিযোগ,সাবেক প্রভাবশালী বলয়ের সদস্য জামিল হোসেনের উত্থান, বদলি-বাণিজ্য ও ঠিকাদার নির্যাতনের অভিযোগে নতুন প্রশ্ন?

স্টাফ রিপোর্টার
জুন ২৪, ২০২৬ ৯:১৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি)-এ আবারও সামনে এসেছে বহুল আলোচিত ‘প্রাইজ পোস্টিং’ সংস্কৃতির অভিযোগ। বদলি-বাণিজ্য, প্রভাব বিস্তার, সুবিধাজনক পদায়ন এবং ঠিকাদারকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন বিআরটিসির কর্মকর্তা মো. জামিল হোসেন।

গত এক বছরের ব্যবধানে তার দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন, অভিযোগকৃত বিপুল অর্থ লেনদেন, রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার দাবি এবং একটি আলোচিত নির্যাতন মামলার তথ্য সামনে আসায় বিআরটিসির অভ্যন্তরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ হয়নি। ফলে বিষয়গুলো নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।

এক বছরে দুই পদায়ন, দুই দফা অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

বিআরটিসির একাধিক সূত্রের দাবি, প্রায় এক বছর আগে জামিল হোসেন বরিশাল বাস ডিপো থেকে টুঙ্গিপাড়া বাস ডিপোতে বদলি হন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ওই বদলিকে কেন্দ্র করে প্রায় ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছিল।

এর এক বছরের মাথায়, ২০২৬ সালের জুন মাসে তিনি টুঙ্গিপাড়া বাস ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ইউনিট প্রধান হিসেবে বদলি হন। ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে জারি হওয়া বিআরটিসির প্রশাসনিক আদেশে এ পদায়নের তথ্য উল্লেখ রয়েছে।

অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর অভিযোগ, এ পদায়নকে ঘিরেও প্রায় ২০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। তবে অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো সরকারি নথি, তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা বিচারিক পর্যবেক্ষণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

‘প্রাইজ পোস্টিং’-এর কেন্দ্রবিন্দুতে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো?

বিআরটিসির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো দীর্ঘদিন ধরেই সংস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী কর্মস্থল হিসেবে পরিচিত।

অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের পদায়নকে ঘিরে অতীতেও ‘প্রাইজ পোস্টিং’ বা কাঙ্ক্ষিত কর্মস্থল বাণিজ্যের আলোচনা ছিল। সংশ্লিষ্টদের দাবি, জামিল হোসেন ধারাবাহিকভাবে এমন কর্মস্থলেই দায়িত্ব পেয়ে আসছেন, যা বিআরটিসির অভ্যন্তরে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সাবেক রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ

বিআরটিসির একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জামিল হোসেন সাবেক চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই সম্পর্কের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ও প্রশাসনিক সুবিধা পেয়েছেন।

আরও অভিযোগ রয়েছে, সরকার পরিবর্তনের পরও তিনি নতুন প্রশাসনিক বলয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে নিজের অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জামিল হোসেনের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঠিকাদার অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগে মামলার তথ্য

জামিল হোসেনকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি এসেছে ঠিকাদার মোহাম্মদ আবুল হাসানের পক্ষ থেকে।

অভিযোগ অনুযায়ী, গাবতলী ডিপোতে দায়িত্ব পালনকালে জামিল হোসেনসহ কয়েকজন ব্যক্তি তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যান, মারধর করেন, ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন এবং অচেতন অবস্থায় ফেলে রেখে যান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ ঘটনায় জামিল হোসেনসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

তবে মামলার বর্তমান অবস্থা, তদন্তের অগ্রগতি কিংবা আদালতের পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।

চেয়ারম্যানকে ঘিরেও বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ

বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান অতিরিক্ত সচিব আব্দুল লতিফ মোল্লা-কেও ঘিরে বিভিন্ন মহলে বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।

বিভিন্ন সূত্রের দাবি, সংস্থার বাস ও ট্রাক ডিপোগুলোতে কর্মকর্তাদের পদায়নের ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন এবং মাসিক আর্থিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন, বিচারিক সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক প্রমাণ এখন পর্যন্ত প্রকাশ হয়নি। চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকেও অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিআরটিসির ভেতরে অস্বস্তি ও ক্ষোভ

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, বিআরটিসির অভ্যন্তরে এখনও বিভিন্ন সময়ের প্রভাবশালী বলয়ের সদস্যরা সক্রিয় রয়েছেন।

তাদের ভাষ্য, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, বদলি এবং পদায়নকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি অস্বচ্ছ ও প্রভাবনির্ভর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ফলে মেধা, যোগ্যতা ও জবাবদিহিতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও প্রভাবকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ পদায়নগুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং জনসেবার মান আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সরকারি আদেশে নতুন পদায়নের তথ্য

১৭ জুন ২০২৬ তারিখে জারি হওয়া বিআরটিসির প্রশাসনিক আদেশ অনুযায়ী, মো. জামিল হোসেনকে টুঙ্গিপাড়া বাস ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ইউনিট প্রধান হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।

আদেশে আগামী ২৫ জুনের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর করে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তদন্তের দাবি জোরালো

এক বছরের ব্যবধানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন, অভিযোগকৃত অর্থ লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং ঠিকাদার নির্যাতনের মামলার তথ্য সামনে আসার পর মো. জামিল হোসেনকে ঘিরে বিআরটিসিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের দাবি, উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়াকে অধিকতর জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ করার জন্য সরকারি নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন বিআরটিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

অনুসন্ধান চলমান

অভিযোগের বিষয়ে মো. জামিল হোসেন, বিআরটিসির চেয়ারম্যান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তিদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য সংগ্রহের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে পরবর্তী প্রতিবেদনে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ