গবেষণার চেয়ে ভবন ও সরঞ্জাম কেনাকাটায় বেশি ব্যয়, স্ত্রীর ফেলোশিপ নিয়ে প্রশ্ন। ফাইল ছবি
দেশের পোল্ট্রি খাতের গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ১৩৪ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও এর মূল উদ্দেশ্য কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। গবেষণার সুফল নিশ্চিত করার পরিবর্তে প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থ ভবন নির্মাণ, জমি অধিগ্রহণ ও ভারী সরঞ্জাম কেনাকাটায় ব্যয় করার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ড. মো. সাজেদুল করিম সরকারের বিরুদ্ধে নিজের স্ত্রীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে মোটা অঙ্কের ফেলোশিপ প্রদান, দরপত্র ছাড়াই কোটি কোটি টাকার কাজ বণ্টন এবং ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ সামনে এসেছে।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) বাস্তবায়নাধীন ‘পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্পের আর্থিক ও প্রশাসনিক নথিপত্র বিশ্লেষণে এসব অসংগতির তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। সরকারি অর্থের ব্যবহার, গবেষণা কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং ফেলোশিপ বিতরণে স্বচ্ছতা নিয়ে এসব অভিযোগ গবেষক মহলে উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
গবেষণার চেয়ে ভবন ও সরঞ্জামে ব্যয় বেশি
প্রকল্পের আর্থিক ও প্রশাসনিক নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পে মোট ১২০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে ৮১ কোটি ২৮ লাখ টাকা, অর্থাৎ মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ, ব্যয় হয়েছে ভবন নির্মাণ, জমি অধিগ্রহণ ও ভারী সরঞ্জাম কেনাকাটায়।
অন্যদিকে, প্রকল্পের মূল লক্ষ্য গবেষণা ও ফেলোশিপ কার্যক্রম হলেও সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যয়ের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। নথিতে গবেষণা ও ফেলোশিপ-সংশ্লিষ্ট খাতে ৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে, যা মোট ব্যয়ের মাত্র ৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
সরকারি অনুমোদন অনুযায়ী গবেষণা খাতে ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকার কথা থাকলেও শুধু পোল্ট্রির খাবার ও ফিড অ্যাডিটিভস কেনার জন্য ১২ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ, এ খাতে ব্যয় মূল বরাদ্দের প্রায় দ্বিগুণ।
এ ছাড়া স্থানীয় প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ ছিল ৪ কোটি ১০ লাখ টাকা। এর বিপরীতে প্রায় ৪৫ শতাংশ অর্থ ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বিদেশি প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ ১ কোটি টাকার মধ্যে কাগজে-কলমে ব্যয় দেখানো হয়েছে মাত্র ১ লাখ টাকা।
প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৯ সালের জুলাইয়ে। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে প্রকল্পের বাজেট বাড়ানো হয় অতিরিক্ত ১০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। তবে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের পেছনে সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক কিংবা যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
পিডির স্ত্রীর ফেলোশিপ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন
প্রকল্পের সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো প্রকল্প পরিচালক ড. মো. সাজেদুল করিম সরকারের স্ত্রী ড. ফারহানা শারমীনকে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপ প্রদান।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো জাতীয় দৈনিক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করেই গোপনে তাঁর জন্য এই ফেলোশিপের সুযোগ তৈরি করা হয়। বিষয়টি নিয়ে ২০২২ সালে সরকারি তদন্তেও অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
বিএলআরআইয়ের স্থায়ী কর্মকর্তা না হওয়া সত্ত্বেও ড. ফারহানা শারমীন মাসিক ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ভাতা গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ফেলোশিপ খাতের বরাদ্দের প্রায় ৬৫ শতাংশ অর্থ একাই তাঁর পেছনে ব্যয় হয়েছে বলে নথিপত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে।
এ নিয়ে প্রকল্পের ফেলোশিপ বিতরণে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা যাচাই এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার যথাযথতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রশিক্ষণেও স্বামী-স্ত্রীর আধিপত্যের অভিযোগ
প্রকল্পের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রশিক্ষণ কোর্সের নির্দেশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুবাদে প্রকল্প পরিচালক ড. সাজেদুল করিম একাধিক প্রশিক্ষণ সেশনে প্রশিক্ষক হিসেবে যুক্ত ছিলেন এবং বড় অঙ্কের সম্মানী গ্রহণ করেছেন।
একই সঙ্গে তাঁর স্ত্রী ড. ফারহানা শারমীনকেও সম্মানীভিত্তিক প্রশিক্ষক হিসেবে রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে স্বামী-স্ত্রীর এমন সম্পৃক্ততা প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নকে সামনে এনেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি প্রকল্পে প্রশিক্ষক নির্বাচন ও সম্মানী প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।
দরপত্র ছাড়াই সাড়ে ৩ কোটি টাকার কাজ বণ্টনের অভিযোগ
প্রকল্পের কেনাকাটা ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এক জুনিয়র ট্রেনিং সহকারী ও একজন হিসাবরক্ষকের মাধ্যমে ভুয়া দোকানের নামে কোটি কোটি টাকার সরবরাহ ভাউচার তৈরি করা হয়েছে।
এ ছাড়া দরপত্র ছাড়াই প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কাজ বণ্টনের অভিযোগ রয়েছে। এসব কাজের ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
গবেষণাগারে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকা সত্ত্বেও ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে চারটি ইনকিউবেটর কেনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও ব্যবহারোপযোগিতা নিশ্চিত না করেই এত ব্যয়বহুল সরঞ্জাম কেনার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া প্রকল্পের মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহন পিডির ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব অনিয়ম অস্বীকার পিডির
অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ও বিএলআরআইয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. সাজেদুল করিম সরকার সব ধরনের অনিয়ম অস্বীকার করেছেন।
তাঁর দাবি, প্রচলিত বিধিবিধান অনুসরণ করে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেই প্রকল্পের সব কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে।
তবে সাবেক ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সুবাদে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পাওয়ার অভিযোগ এবং তাঁর স্ত্রীর ফেলোশিপ-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের বিষয়ে তিনি কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে চাননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএলআরআইয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, রাজনৈতিক প্রভাব ও তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠতার সুবাদে ড. সাজেদুল করিম সরকার গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পের দায়িত্ব পেয়েছিলেন বলে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে আলোচনা রয়েছে। আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে তাঁর ভূমিকা নিয়েও প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে ও বাইরে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
গবেষণা খাতে জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই প্রকল্পে রাষ্ট্রীয় অর্থের ব্যবহার, গবেষণা কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, সরকারি প্রকল্পের জটিল হিসাব-নিকাশ ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বলয় ব্যবহার করে যদি ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থ হাসিলের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে তা দেশের সামগ্রিক গবেষণা খাতের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
প্রাণিসম্পদ গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি খাতে প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিরপেক্ষ নিরীক্ষা ও দুদকের তদন্তের দাবি
প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ, কেনাকাটা, ফেলোশিপ বিতরণ, প্রশিক্ষণ আয়োজন এবং রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমের সম্পূর্ণ হিসাব নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে নিরীক্ষার দাবি উঠেছে।
একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাঁদের মতে, প্রকল্পের প্রতিটি খাতে অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, ফেলোশিপ বিতরণে যোগ্যতা ও বিধিবিধান অনুসরণ করা এবং কেনাকাটায় সরকারি ক্রয়বিধি বাস্তবায়ন করা জরুরি।
অন্যথায়, বিপুল অর্থ ব্যয়ে গৃহীত এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য—পোল্ট্রি খাতের গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি—ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে দেশের পোল্ট্রি খাতের টেকসই উন্নয়ন ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রত্যাশাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
