শনিবার, ৩১শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চন্দনাইশ পৌরসভায় ৩০ শতাংশ কমিশন ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ, বিতর্কে প্রকৌশলী রাজীব

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ৩১, ২০২৬ ৮:১৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

প্রকল্পের বিল ছাড়, সাইট পরিদর্শন থেকে ভবন নির্মাণের অনুমোদন—বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম ও ঘুষ দাবির অভিযোগ; তদন্তের নির্দেশের পরও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার প্রশ্ন। ফাইল ছবি

চন্দনাইশ পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) রাজীব মজুমদারের বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ভুক্তভোগী, ঠিকাদার ও সাব-ঠিকাদারদের অভিযোগ, পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়নকাজের বিল ছাড়, সাইট পরিদর্শন এবং ইমারত নির্মাণের অনুমোদনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যের এক চক্র। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি কাজের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দাবি করা হয়।

২০১৭ সালে বান্দরবান পৌরসভায় নকশাকার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন রাজীব মজুমদার। পরবর্তীতে চন্দনাইশ পৌরসভায় বদলি হওয়ার পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ সামনে আসতে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর কর্মকাণ্ডে পৌরসভার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে তাঁর সময়কালের সব প্রকল্পের নথিপত্র তলব এবং তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, এত কিছুর পরও তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

‘সব ম্যানেজ করেই তো খাই’—রাজীবের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সাব-ঠিকাদারদের অভিযোগ, চন্দনাইশ পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়নকাজের বিল ছাড় এবং সাইট পরিদর্শনের ক্ষেত্রে উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাজীব মজুমদারের নির্দিষ্ট কমিশন ও অর্থ দাবির অভিযোগ রয়েছে।

ঠিকাদার মো. তসলিম উদ্দীনের অভিযোগ, প্রতিটি কাজের বিপরীতে রাজীব মজুমদার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায় করেন। চন্দনাইশ হাসপাতালের গেট নির্মাণকাজ থেকেই তিনি ৯০ হাজার টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন ওই ঠিকাদার।

অভিযোগ রয়েছে, কোনো নির্মাণকাজের সাইটে একবার পরিদর্শনে গেলেই ঠিকাদারকে নগদ ৪ হাজার টাকা ‘পরিদর্শন ফি’ দিতে হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন অজুহাতে নথিপত্র ও বিল আটকে রাখার অভিযোগও রয়েছে।

এমনকি ঠিকাদারদের দাবি পূরণের পরও চূড়ান্ত বিলের বিপরীতে অতিরিক্ত ৬ শতাংশ কমিশন দাবি করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

ইমারত নির্মাণের অনুমোদনেও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

স্থানীয় বাসিন্দা ও এলডিপির পৌরসভা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আকতার উদ্দীনের দায়ের করা অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ইমারত নির্মাণ অনুমোদন কমিটির নিয়মিত প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে সরাসরি ফাইল অনুমোদনের কথা বলে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে রাজীব মজুমদারের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ অনুযায়ী, আবদুল শুক্কুরের কাছ থেকে ৩৮ হাজার টাকা, হামিদুল্লাহ সিকদারের কাছ থেকে ৪৫ হাজার টাকা এবং শাহা আলমের কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, অর্থ নেওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ফলে একদিকে অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা, অন্যদিকে অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতায় তাঁদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

পানি সরবরাহ ও ল্যাট্রিন প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়নেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে রাজীব মজুমদারের বিরুদ্ধে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে পানি সরবরাহ লাইনে নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার এবং নকশায় নির্ধারিত গভীরতার অর্ধেক পরিমাণে পাইপ বসিয়ে মাটি ভরাটের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অনেক স্থানে পাইপ না বসিয়েই সম্পূর্ণ বিল উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।

পাশাপাশি অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৮০০টি পিট ল্যাট্রিনের তালিকা তৈরির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব ক্ষেত্রে টয়লেট নির্মাণ না করেই অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

অডিটে ২১ লাখ ৪৪ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতির তথ্য

২০২১-২০২২ থেকে ২০২৩-২০২৪ অর্থবছর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (দ্বিতীয় পর্যায়) আওতায় পরিচালিত অডিটে আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অডিটসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বিসি রাস্তার ব্রিক ওয়ালে অতিরিক্ত বিল প্রদান এবং আর্থ ফিলিংয়ের ক্ষেত্রে বক্স কাটিংয়ের মাটি কর্তন না দেখানোর মাধ্যমে সরকারের ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৬১০ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বাস্তবায়ন, বিল প্রদান এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অতিরিক্ত দায়িত্বের অপব্যবহারের অভিযোগ, ১০ কোটি টাকার কাজ ভাগিয়ে নেওয়ার দাবি

পৌরসভার সচিবের শূন্যপদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের সুযোগে রাজীব মজুমদারের বিরুদ্ধে নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা ঠিকাদারদের মাধ্যমে প্রায় ১০ কোটি টাকার কাজ ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, পর্যাপ্ত পুঁজি ও কার্যকর তদারকির অভাবে দুলারপাড়া-দুর্লভপাড়া এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নকাজ ধীরগতিতে চলছে। বিশেষ করে গাছবাড়ীয়া খাঁনহাট থেকে আব্দুল বারী হাট পর্যন্ত সড়কের দুর্লভপাড়া বটতল এলাকার পুকুরপাড়ের কাজ ‘নিপা এন্টারপ্রাইজ’ ফেলে রাখায় ওই অংশ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বাঁশের নড়বড়ে সাঁকো ও নিরাপত্তাহীন পরিবেশের মধ্য দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ও শিক্ষার্থী ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন। দীর্ঘদিন ধরে কাজ অসমাপ্ত থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

অন্যদিকে, প্রায় ১২০ কোটি টাকার পানি শোধনাগার প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা থাকলেও পৌরবাসী নিয়মিত পানি পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

দুদক ও দপ্তরে অভিযোগ, তদন্তের নির্দেশের পরও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই

রাজীব মজুমদারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, প্রভাব খাটিয়ে এসব অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার শাখার উপপরিচালক মোছাম্মৎ রাশেদা আক্তারের স্বাক্ষরিত স্মারকে সুনির্দিষ্ট তদন্ত এবং প্রকল্পের ফাইল তলবের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) রাজীব মজুমদারের সঙ্গে মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি

চন্দনাইশ পৌরসভার উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও এলাকাবাসী।

তাঁদের দাবি, অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্ত করে প্রকল্পের নথিপত্র, বিল-ভাউচার, অডিট প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি পৌরসভার উন্নয়নকাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও পৌর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে। বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।