মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতরের উপপরিচালক (উপসচিব) উম্মে হাবিবার বিরুদ্ধে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়ম, কোটেশন কারসাজি এবং সরকারের লাখ লাখ টাকা অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, অনিয়মে বাধ্য করা এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি কাজ বণ্টনের অভিযোগও সামনে এসেছে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ জুন তাকে বস্ত্র অধিদফতরের পরিচালক পদে বদলি করা হয়। বদলির প্রজ্ঞাপনে ২২ জুনের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও তিনি আগের কর্মস্থলেই বহাল রয়েছেন বলে অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বদলির আদেশ বাতিল করতে তিনি বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।
টেন্ডারে সিন্ডিকেট, নিয়ম ভেঙে কার্যাদেশের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দফতরের টেন্ডার, কেনাকাটা ও প্রচার-প্রচারণার অধিকাংশ কাজ একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পিপিআর (Public Procurement Rules) অনুসারে সর্বনিম্ন দরদাতা নির্বাচিত হওয়ার পরও তাদের বাদ দিয়ে সিন্ডিকেটভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—
. আইডি নং ১২৩৯৭৭৩ টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতা তিথি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং ৯ লাখ ৫৬ হাজার ৫৪৪ টাকা দর দিলেও কার্যাদেশ দেওয়া হয় পঞ্চম সর্বনিম্ন দরদাতা রায়আন ট্রেডার্সকে, যার দর ছিল ১০ লাখ ৭৪ হাজার ৬৬১ টাকা।
. আইডি নং ১২৩৯৭৩৪ টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতা একুশে মিডিয়াকে বাদ দিয়ে চতুর্থ সর্বনিম্ন দরদাতা রায়আন ট্রেডার্সকে কাজ দেওয়া হয়েছে।
. আইডি নং ১১৮৮৩৫৯ টেন্ডারেও প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার অনুকূলে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিটি কেনাকাটায় সরকারের অর্থের অপচয় হয়েছে।
ভুয়া বিল, কাজ ছাড়াই অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে যথাযথভাবে মালামাল সরবরাহ ছাড়াই বিল পরিশোধ করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কাজ সম্পন্ন না করেই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে।
প্রিন্টিং ও প্রচার-প্রচারণার অধিকাংশ কাজ রায়আন প্রিন্টার্স এবং ভিডিও প্রচারণার কাজ নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি ও শাস্তিমূলক বদলির অভিযোগ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকাসহ চারটি আঞ্চলিক কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করতে চাপ দেওয়া হতো। অভিযোগ অনুযায়ী, কেউ আপত্তি জানালে চাকরিচ্যুতির হুমকি, বেতন বন্ধের ভয় এবং দুর্ব্যবহারের শিকার হতে হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রতিবাদ করায় দুই কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বদলি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আগের কর্মস্থল নিয়েও বিতর্ক
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, উম্মে হাবিবা এর আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলেন এবং সে সময়ও নানা বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পর তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হলেও পরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতরে উপপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
জনপ্রশাসন সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ
জানা গেছে, সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে জনপ্রশাসন সচিব বরাবর একটি লিখিত অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। মো. রাকিবুল আলম খান স্বাক্ষরিত ওই অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, উম্মে হাবিবার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দফতরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে এবং একক সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কারণে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে।
এছাড়া অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি নিজেকে প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন মহলের নাম ব্যবহার করেন এবং নিজের অবস্থান ধরে রাখতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন।
তবে উল্লেখ্য, উল্লিখিত অভিযোগগুলো অভিযোগকারী পক্ষের দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য বা সরকারি তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা সংযুক্ত করা হলে প্রতিবেদনটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ হবে।
