ফাইল ছবি
দেশের স্বাস্থ্য খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সংস্কারের প্রত্যাশার মধ্যেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চুক্তিভিত্তিক সচিব মো. কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, চিকিৎসক বদলি ও পদোন্নতিতে ঘুষ গ্রহণ, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব প্রদান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক অনিয়মের একাধিক অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই সচিব কামরুজ্জামান মন্ত্রণালয়ের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এতে প্রশাসনিক ভারসাম্য, জবাবদিহি ও নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
একক সিদ্ধান্তে দায়িত্ব বণ্টন, প্রশাসনে প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখায় কর্মকর্তা পদায়ন ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে মন্ত্রী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরামর্শ ছাড়াই একক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন কর্মকর্তাকে সচিবের আস্থাভাজন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে রাখা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্ত্রণালয়ের ভেতরেও নানা আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে।
টেন্ডার ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ
বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়, অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে কমিশন বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ডেলিগেশন অব ফিন্যান্সিয়াল পাওয়ার অনুযায়ী মন্ত্রী পর্যায়ে অনুমোদনের বিষয় থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সচিব নিজেই অনুমোদন দিয়েছেন। আবার অনেক নথি দীর্ঘদিন আটকে রেখে সংশ্লিষ্টদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
চিকিৎসক বদলি ও পদোন্নতিতে ঘুষের অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, চিকিৎসকদের বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন ছাড়া অনেক ফাইল এগোয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েক লাখ থেকে আরও বেশি অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি। সমঝোতা না হলে ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতের এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর সঙ্গে সচিবের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই ব্যবসায়ীর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার, নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা প্রদান এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রতিবেদনে উপস্থাপিত না হলেও সংশ্লিষ্ট মহল বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
নথি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা, সেবায় প্রভাবের অভিযোগ
মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, সচিবের দপ্তরে বহু নথি ১০ থেকে ৩০ দিন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও দীর্ঘ সময় ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকে। এতে প্রশাসনিক কার্যক্রমের গতি কমে যাচ্ছে এবং স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে।
সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক—মত সংশ্লিষ্টদের
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বললেও যদি এ ধরনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত না হয়, তবে প্রশাসনের প্রতি জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই জনস্বার্থে অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর প্রতিক্রিয়া এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
প্রশাসন বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, স্বাস্থ্য খাত দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনসেবামূলক খাত। তাই সচিবের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা অন্য কোনো স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা হলে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে এবং জনমনে বিদ্যমান প্রশ্নেরও জবাব মিলবে।
