রবিবার, ১৯শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

জাগৃকের দুই প্রকৌশলীর খামখেয়ালিপনায় ১৭ কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগ, কাজ শেষের আগেই বিল পরিশোধ, ৯২ কোটি টাকার প্রকল্প বেড়ে ১০৯ কোটি—প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় প্রশ্নের মুখে দুই প্রকৌশলী

নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই ১৯, ২০২৬ ১:১৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

চট্টগ্রামের ফিরোজশাহ ও হালিশহর হাউজিং এস্টেটে সরকারি আবাসন নির্মাণ প্রকল্প ঘিরে উঠেছে ব্যাপক অনিয়ম, ব্যয় বৃদ্ধি এবং কাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে বিল পরিশোধের অভিযোগ। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী সোহেল সরকার এবং পরবর্তীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী কাজী নজরুল ইসলাম। অভিযোগকারীদের দাবি, দুই কর্মকর্তার খামখেয়ালিপনা, দায়িত্বে অবহেলা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে সরকারের অন্তত ১৭ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, শুরুতে ৯২ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদিত প্রকল্পটি পরবর্তীতে সংশোধিত উন্নয়ন প্রস্তাবের মাধ্যমে ১০৯ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু অতিরিক্ত ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রকল্পের পরিধিতে দৃশ্যমান কোনো বড় পরিবর্তন না এলেও ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ভবনের কাজ অসমাপ্ত থাকা সত্ত্বেও কাগজে-কলমে কাজ শেষ দেখিয়ে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

চারটি ১০ তলা ভবন, ৩৪২ ফ্ল্যাট—তবুও ব্যয় বৃদ্ধির ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফিরোজশাহ ও হালিশহর হাউজিং এস্টেটে আধুনিক আবাসন সুবিধা গড়ে তুলতে ১ দশমিক ৪৫ একর জমির ওপর চারটি ১০ তলা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পে মোট ৩৪২টি ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। শুরুতে ব্যয় ধরা হয় ৯২ কোটি টাকা, পরে সংশোধিত ডিপিপির মাধ্যমে তা বাড়িয়ে ১০৯ কোটি টাকা করা হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, অতিরিক্ত ব্যয়ের পক্ষে যে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তব কাজের মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাদের মতে, অতিরিক্ত কোনো ভবন, মৌলিক নকশা পরিবর্তন কিংবা দৃশ্যমান অবকাঠামো নির্মাণের প্রমাণ নেই। ফলে অতিরিক্ত ১৭ কোটি টাকা কোথায় ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অসমাপ্ত কাজ, তবুও শতভাগ বিল?

অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকল্পের শুরুতে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন প্রকৌশলী সোহেল সরকার। তার সময়েই গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে তিনি রাজশাহীতে বদলি হলে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব নেন প্রকৌশলী কাজী নজরুল ইসলাম। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দায়িত্ব পরিবর্তনের পরও অনিয়মের ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়নি; বরং কাজ অসমাপ্ত রেখেই বিল পরিশোধের মতো গুরুতর সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।

সরকারি নথি অনুযায়ী, ভবন-১/এ ও ১/বি-এর দশম তলার ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হলেও ভেতরের ইটের গাঁথুনি ও প্লাস্টারের কাজ চলমান ছিল। অন্যদিকে ভবন-২ ও ভবন-৩-এর অষ্টম তলার ছাদ ঢালাই শেষ হলেও নবম তলার নির্মাণকাজ চলছিল।

এ অবস্থায় অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, যখন কাঠামো, প্লাস্টার, ফিনিশিং ও অন্যান্য প্রকৌশলগত কাজ চলমান ছিল, তখন কীভাবে প্রকল্পকে সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত দেখিয়ে বিল পরিশোধ করা হলো? তাদের মতে, এটি সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

মেজারমেন্ট বুক ও বিল ভাউচার তদন্তের দাবি

প্রকল্প বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ নথির মধ্যে রয়েছে মেজারমেন্ট বুক (এমবি), বিল ভাউচার, কারিগরি পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং কাজের অগ্রগতির সনদ।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব নথি নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করলে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রকৃত অবস্থা এবং বিল পরিশোধের বৈধতা স্পষ্ট হবে। তাদের অভিযোগ, বাস্তবে নির্মাণকাজ অসমাপ্ত থাকলেও কাগজে-কলমে শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পূর্ণাঙ্গ বিল উত্তোলনের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।

তাদের আরও দাবি, সরকারি প্রকল্পে এ ধরনের অনিয়ম কোনো একক কর্মকর্তার পক্ষে করা সম্ভব নয়; বরং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের অনুমোদন ও তদারকির দুর্বলতার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

ব্যয় বৃদ্ধি নিয়েও বাড়ছে বিতর্ক

অভিযোগকারীদের মতে, কোনো সরকারি প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি করতে হলে তার সুস্পষ্ট কারিগরি, আর্থিক ও প্রশাসনিক কারণ থাকতে হয়। পাশাপাশি সংশোধিত ব্যয়ের বিপরীতে অতিরিক্ত কী কাজ হয়েছে, তার বিস্তারিত হিসাবও নথিভুক্ত থাকার কথা। কিন্তু এই প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়ের দৃশ্যমান প্রতিফলন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

তাদের অভিযোগ, কার্যকর তদারকি থাকলে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনোভাবেই শতভাগ বিল ছাড় হওয়ার সুযোগ ছিল না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যদি যথাযথভাবে কাজের অগ্রগতি যাচাই করতেন, তাহলে অসমাপ্ত প্রকল্পে পূর্ণাঙ্গ বিল পরিশোধের ঘটনা ঘটত না।

ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগও উঠেছে

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের মতে, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং জবাবদিহির অভাবের সুযোগেই অনিয়মের বিস্তার ঘটেছে।

এদিকে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিল অনুমোদন, ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন আর্থিক সিদ্ধান্তে অনৈতিক লেনদেন হয়েছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ এই প্রতিবেদনের হাতে আসেনি। ফলে বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ।

স্বাধীন তদন্তের দাবি

জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সরকারি অর্থে পরিচালিত বড় প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি এবং কাজ অসমাপ্ত রেখেই বিল পরিশোধের মতো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। তাদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা নিরূপণে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।

তাদের মতে, তদন্তের আওতায় প্রকল্পের মূল ও সংশোধিত নকশা, ব্যয় বৃদ্ধির অনুমোদন, মেজারমেন্ট বুক, বিল ভাউচার, তদারকি প্রতিবেদন, কার্যাদেশ, কাজের অগ্রগতির ছবি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি পরীক্ষা করা উচিত। পাশাপাশি সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে বাস্তব অগ্রগতি ও নথিপত্রের মিল রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি ধাপেই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় উন্নয়ন প্রকল্পের নামে জনগণের অর্থ অপচয় এবং আর্থিক অনিয়মের ঝুঁকি থেকেই যাবে।

অভিযুক্তদের বক্তব্য মেলেনি

অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকৌশলী সোহেল সরকারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী কাজী নজরুল ইসলাম, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পর্যন্ত তারা কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।

সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হবে।

সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তে প্রমাণিত হলে সরকারি অর্থের ক্ষতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর যদি তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া যায়, তাহলে সেটিও জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন, যাতে প্রকল্প নিয়ে বিদ্যমান বিতর্কের অবসান ঘটে এবং জনমনে সৃষ্ট বিভ্রান্তি দূর হয়।

উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদনে বর্ণিত অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো কোনো তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
সারাবাংলা সর্বশেষ