শনিবার, ৭ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রাইয়ান বিল্ডিং টেকনোলজির মালিক মজিবুর রহমানকে খুঁজছে পুলিশ জমির শেয়ার ও ফ্ল্যাট বিক্রির নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, পাঁচ থানায় অর্ধশতাধিক ভুক্তভোগী

নিজস্ব প্রতিবেদক
নভেম্বর ৭, ২০২৬ ৫:২৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপি—ক্ষমতার পালাবদলে রাজনৈতিক পরিচয় বদলে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ; দুই ভাই ও সহযোগীর নামও আলোচনায়। ফাইল ছবি

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ, আর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির লোক পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার—এমন অভিযোগ উঠেছে রাইয়ান বিল্ডিং টেকনোলজি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জমির শেয়ার ও ফ্ল্যাট বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নেওয়া, চুক্তি অনুযায়ী জমির মালিকানা বুঝিয়ে না দেওয়া এবং অর্থ ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে তাকে খুঁজছে গুলশান, বনানী, ভাটারা, বাড্ডা ও রামপুরা থানার পুলিশ।

ভুক্তভোগীদের দাবি, রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে নিজেকে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করেন মজিবুর। কখনো আওয়ামী লীগ, আবার কখনো বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করে মানুষের আস্থা অর্জন করেন। তার বিরুদ্ধে জমির শেয়ার বিক্রি, ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রতিশ্রুতি, পাঁচতারা হোটেলে বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রকল্পের নামে অর্থ সংগ্রহ করে আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগে তার দুই ভাই ইব্রাহীম ও আবদুস সালাম এবং সহযোগী গোলাম সরোয়ার হিরুর নামও এসেছে।

অর্ধশতাধিক ভুক্তভোগী পাঁচটি থানায় পৃথকভাবে অভিযোগ করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে অভিযোগগুলোর সবকটির বিষয়ে স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ঝামেলাপূর্ণ জমিতে সাইনবোর্ড, এরপরই শেয়ারের ব্যবসা

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জমির মালিকানা, জরিপ, রেকর্ড, উত্তরাধিকার কিংবা নামজারি নিয়ে জটিলতা রয়েছে—এমন জমি চিহ্নিত করে সেখানে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। কোনো পক্ষের কাছ থেকে চার-পাঁচ লাখ টাকা বায়না দিয়ে জমির ওপর মালিকানার সাইনবোর্ড স্থাপন করে বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে ফ্ল্যাট বা জমির শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়।

কোথাও বাজারমূল্যের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কম দামে ফ্ল্যাট দেওয়ার বিজ্ঞাপন, কোথাও ঢাকায় নিজের স্থায়ী ঠিকানা গড়ার স্বপ্ন দেখানো হয়। আবার কোথাও বিনিয়োগের মাধ্যমে দ্বিগুণ মুনাফার আশ্বাস দেওয়া হয়। এসব প্রলোভনে পড়ে অনেকেই জমির শেয়ার কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।

শুধু রাজধানী নয়, কুয়াকাটা ও কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত এলাকায় পাঁচতারা হোটেল নির্মাণের কথা বলেও বিনিয়োগ সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বিলাসবহুল হোটেলের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করে হোটেলের মালিকানার শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হতো বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

পুলিশ প্লাজার পেছনে ২০ লাখ টাকার শেয়ার, মেলেনি জমির মালিকানা

২০২৪ সালে হাতিরঝিলের উত্তর অংশে পুলিশ প্লাজার পেছনের এলাকায় রাইয়ান বিল্ডিং টেকনোলজি লিমিটেডের একটি সাইনবোর্ড দেখে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন শামীম আহমদ নামের এক ব্যক্তি।

অভিযোগ অনুযায়ী, সাড়ে সাত কাঠা জমির একটি শেয়ার থেকে তিন বেডরুমের ১২০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের মালিকানা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন মজিবুর রহমান। শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ২৩ লাখ টাকা। পরে তিন লাখ টাকা ছাড় দিয়ে ২০ লাখ টাকায় চুক্তি হয়।

২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি উত্তরা ব্যাংকের চেকের মাধ্যমে শামীম আহমদের কাছ থেকে প্রথমে ১৫ লাখ টাকা নেন মজিবুর। পরবর্তী সময়ে একই ব্যাংক হিসাব থেকে আরও তিন লাখ টাকা গ্রহণ করেন। এরপর ১৮ জুন মজিবুর রহমানের পরিচালিত ব্যাংক এশিয়ার বসুন্ধরা আবাসিক শাখার হিসাবে আরও দুই লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ২০ লাখ টাকা পরিশোধ করেন শামীম।

কিন্তু অভিযোগকারীর দাবি, টাকা নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও জমির শেয়ার রেজিস্ট্রেশন করে দেওয়া হয়নি। অর্থ ফেরতও পাননি তিনি।

ওই জমিতে লাগানো সাইনবোর্ডে বায়না সূত্রে মজিবুর রহমান ও গোলাম সরোয়ার হিরুর মালিকানার কথা উল্লেখ ছিল। জমির পরিমাণ দেখানো হয়েছিল ৭ দশমিক ৫০ কাঠা। সাইনবোর্ডের ‘রাইয়ান’ নামের নকশা ও লোগো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, এটি দেখতে রূপায়ণ হাউজিংয়ের লোগোর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা দেখে সাধারণ ক্রেতারা বিভ্রান্ত হতে পারেন।

তবে প্রতিবেদন তৈরির আগে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে ওই সাইনবোর্ড আর দেখা যায়নি।

স্থানীয়দের বক্তব্যেও উঠে এসেছে দুই সহযোগীর নাম

পুলিশ প্লাজার পেছনের এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে মজিবুর রহমান ও গোলাম সরোয়ার হিরুর নাম পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদকের দাবি। সোহেল নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, মজিবুর রহমানকে তিনি এম রহমান নামে চেনেন। তার সঙ্গে গোলাম সরোয়ার হিরুকে দেখা যেত। দুজনের বিরুদ্ধেই ফ্ল্যাট বিক্রির নামে মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়া ও প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

ওই বাসিন্দার ভাষ্য, হিরু আগে গুলশানের একটি পাঁচতারা হোটেলে ওয়েটারের কাজ করতেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যবসা ও ফ্ল্যাটসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। তার প্রশ্ন, সাধারণ চাকরি করে কীভাবে একাধিক ব্যবসা ও সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব হয়েছে?

এসব বক্তব্য স্থানীয় বাসিন্দার ব্যক্তিগত দাবি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পদের উৎস ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মুখেও প্রতারণার অভিযোগ

মজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, একই আবাসিক ভবনের যৌথ উদ্যোক্তা এবং সাদমান হলিডে টুরিজম কোম্পানির মালিক সাইফুর রহমান মানিক তার বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন।

মানিকের দাবি, মজিবুর রহমানের প্রকৃত ব্যবসা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। তার ভাষ্য, নারীদের ব্যবহার করে কাউকে প্রলুব্ধ করা এবং পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও কিংবা তথ্যের মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়ের কৌশল নেওয়া হয়।

মানিক আরও অভিযোগ করেন, মজিবুর রহমান বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সম্পদ গড়েছেন। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তার একাধিক প্লট ও সম্পদ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। বিদেশেও তার পরিচিতি ও যোগাযোগের নেটওয়ার্ক রয়েছে বলে জানান।

তার দাবি, মজিবুরের নিজস্ব কোনো সম্পূর্ণ ভবন না থাকলেও যৌথভাবে নির্মিত ভবনের শেয়ার দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। বর্তমানে পাওনাদারদের চাপের মুখে তিনি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আত্মগোপনে রয়েছেন বলে মানিকের ধারণা।

এ ছাড়া মজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত জীবন, নারীসঙ্গ এবং বিভিন্ন হোটেল ও বারে যাতায়াত নিয়েও একাধিক অভিযোগ করেন মানিক। তবে এসব ব্যক্তিগত অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

চাকরির আশ্বাস ও যৌন হয়রানির অভিযোগ, মুখ খুলছেন না ভুক্তভোগীরা

রাইয়ান বিল্ডিং টেকনোলজিতে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন এবং যৌন নিপীড়নের অভিযোগও উঠেছে মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে।

প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে ১১ জন তরুণীর সন্ধান পাওয়ার দাবি করা হয়েছে, যারা চাকরির আশ্বাসে মজিবুর রহমানের দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। কয়েকজনের কাছে ঘটনার ভিডিও ও অন্যান্য তথ্যপ্রমাণ রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

তাদের অভিযোগ, কাউকে মাসিক ৫০ হাজার, আবার কাউকে এক লাখ টাকা বেতনে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কাউকে ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

ভুক্তভোগীদের কয়েকজন সামাজিক লোকলজ্জা ও হয়রানির আশঙ্কায় প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে অনাগ্রহী বলে জানা গেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধেও সহযোগিতার অভিযোগ

মজিবুর রহমানের ছোট ভাই ইব্রাহীমের বিরুদ্ধেও ফ্ল্যাট বিক্রির নামে অর্থ সংগ্রহের কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। রাইয়ান বিল্ডিং টেকনোলজি লিমিটেডের নামে পরিচালিত ফেসবুক পেজে ভিডিও প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে বাজারমূল্যের চেয়ে ৪০ শতাংশ কম দামে ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয় বলে জানা গেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ওই প্রচারণায় ইব্রাহীম যুক্ত ছিলেন। তার আগে গাজীপুরের গ্রিন লাইফ গার্মেন্টসে চাকরি করার তথ্য পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু ফয়সাল মুসাব্বিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ইব্রাহীম নামে বরগুনার একজন ব্যক্তি তার কারখানায় কাজ করতেন বলে মনে পড়ে। চুরির অভিযোগে সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের পর তাকে কারখানা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। পরে একজন সাংবাদিক নেতার অনুরোধে ওই কর্মীকে অতিরিক্ত এক লাখ ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে মজিবুরের বড় ভাই আবদুস সালাম বাড্ডা থানার পূর্ব পাশে আনন্দনগর এলাকায় দুটি প্লট দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছেন বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তিনি নিজেকে শ্রমিক দলের বা বিএনপির নেতা পরিচয় দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

উত্তরখানের চার কাঠা জমির নামে ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা

রাজধানীর ভাটারা থানায় গত মাসের ২১ তারিখে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন দক্ষিণ মান্ডা, মুগদা এলাকার বাসিন্দা আবদুস সালাম।

তার অভিযোগ, উত্তরখানে চার কাঠা জমি রেজিস্ট্রেশন করে দেওয়ার কথা বলে ২০২২ সালে মজিবুর রহমান তার কাছ থেকে ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা গ্রহণ করেন। পাঁচশ টাকার স্ট্যাম্পে টিপসই ও স্বাক্ষর নিয়ে বায়না চুক্তি করা হয়েছিল।

কিন্তু জমি পরিমাপ করতে গিয়ে তিনি দেখতে পান, তার জন্য নির্ধারিত জমিতে অন্য ব্যক্তিদের মালিকানা দাবি করে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। বিষয়টি মজিবুর রহমানকে জানালে দ্রুত জমির সীমানা নির্ধারণ ও রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেওয়া হয়।

অভিযোগকারীর দাবি, প্রায় তিন বছর পার হলেও জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি, ফেরত দেওয়া হয়নি টাকাও। এমনকি যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না।

আবদুস সালামের লিখিত বক্তব্যে আরও অভিযোগ করা হয়, মজিবুর রহমান বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার ও পাওনাদারদের ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করেছেন। পাওনা টাকা চাইলে মামলা দিয়ে হয়রানি করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে তার দাবি।

ভাটারা থানায় পুলিশি তৎপরতা

আবদুস সালামের অভিযোগ পাওয়ার পর ভাটারা থানা পুলিশ মজিবুর রহমানকে খুঁজছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, পূজার ছুটির দুদিন আগে এসআই ফরহাদ নামে পুলিশের এক কর্মকর্তা মজিবুর রহমানকে থানায় নিয়ে এসেছিলেন। পরে পাওনাদারদের টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকারের পর পরিবারের সদস্যরা তাকে সেখান থেকে ছাড়িয়ে নেন বলে দাবি করা হয়েছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযোগকারীদের জানানো হয়েছে, মজিবুর রহমানকে পাওয়া গেলে এবং অভিযোগের সত্যতা ও প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে পাঁচ থানায় অর্ধশতাধিক অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর পূর্ণাঙ্গ নথি ও মামলার বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

২০ লাখ টাকা নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারও

শুধু সাধারণ গ্রাহক নন, সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে অর্থসংক্রান্ত প্রতারণার অভিযোগ তুলেছেন।

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের একজন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দাবি করেন, শেয়ার রেজিস্ট্রেশনের মধ্যস্থতার কথা বলে তার কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাকে দেওয়া তথ্য সঠিক ছিল না এবং চুক্তি অনুযায়ী কাজও সম্পন্ন হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, তার বৈধ আয়ের টাকা নিয়ে প্রতারণা করা হয়েছে। এ বিষয়ে মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তার একটি ভবন নির্মাণের বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন ওই কর্মকর্তা।

অভিযোগটির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা ও মজিবুর রহমানের বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ যাচাই প্রয়োজন।

রনি মাহমুদের ২১ লাখ টাকা পাওনার অভিযোগ

বাড্ডায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে অলিভ লাউঞ্জ রেস্তোরাঁর মালিক রনি মাহমুদও মজিবুর রহমানের কাছে ২১ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে বলে দাবি করেছেন।

রনি মাহমুদের ভাষ্য, মজিবুর রহমান দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের লোকজনের সঙ্গে চলাফেরা করেছেন। বর্তমানে বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো আড়াল করার চেষ্টা করছেন বলে তিনি মনে করেন।

তবে টাকা উদ্ধারে কী ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

থানার বাইরে পাওনাদারকে আটকে মারধরের অভিযোগ

রাইয়ান বিল্ডিং টেকনোলজি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়।

এ সময় তিনি বলেন, তার কাছে কেউ টাকা পায় না। বরং তার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী কয়েকজন আওয়ামী লীগ করতেন বলে দাবি করেন। রনি মাহমুদসহ কয়েকজনকে বাড্ডা থানায় নিয়ে আটকে মারধর করে স্ট্যাম্পে লিখিত নেওয়ার কথাও তিনি বলেন।

তার দাবি, রনি মাহমুদ তার কাছে টাকা পান না। তারপরও ওসির অনুরোধে তাকে এক লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। রনি মাহমুদ তার প্রকল্প ও অফিসের পরিচয় ব্যবহার করে অন্যদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে তার ক্ষতি করেছেন বলেও অভিযোগ করেন মজিবুর।

একপর্যায়ে তিনি প্রতিবেদককে একটি ফোন ধরিয়ে দেন এবং সেটিকে ওসি পরিচয়ে উপস্থাপন করেন। ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি বলেন, রাইয়ান বিল্ডিংয়ের এমডির কাছে কেউ টাকা পান না এবং আগের দিন একটি সালিশের মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করা হয়েছে। তবে ফোনে কথা বলা ব্যক্তির পরিচয় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে রনি মাহমুদ তার ২১ লাখ টাকা পাওনার দাবি থেকে সরে আসেননি।

অফিসের ঠিকানা ও আত্মগোপনের অভিযোগ

রাইয়ান বিল্ডিং টেকনোলজি লিমিটেডের কার্যালয় হিসেবে রাজধানীর বারিধারা নতুনবাজার এলাকার একটি ঠিকানা প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের পরিধি ও জনবল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফেসবুক পেজে প্রচারণা থাকলেও নিয়মিত অফিস কার্যক্রম ও কর্মীদের উপস্থিতি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তারা।

মজিবুর রহমানের গ্রামের বাড়ি বরগুনা বলে জানা গেছে। তার পিতা রশিদ হাওলাদার এবং মাতা আমবিয়া বেগম। গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য, একসময় তিনি ঢাকায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তবে তার বর্তমান ব্যবসা ও সম্পদের বিষয়ে গ্রামের লোকজনের কাছে হালনাগাদ তথ্য নেই।

অভিযোগকারীদের দাবি, ভাটারা থানায় একাধিক অভিযোগ জমা হওয়ার পর বারিধারার অফিসার্স টাওয়ারের ঠিকানা থেকে তিনি সরে গেছেন। বর্তমানে স্ত্রীর নামে কেনা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি ফ্ল্যাটে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রের বরাত দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া তেজগাঁও এলাকার আবদুস সালাম নামের আরেক ব্যক্তির সঙ্গেও বড় ধরনের আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।

এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে ফেসবুকে খোঁজ

মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগকারী আবদুস সালাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ছবি দিয়ে পোস্ট করেছেন। সেখানে তাকে খুঁজে দিতে পারলে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

পাওনাদারদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। কেউ টাকা ফেরত চাইলে নানা অজুহাত দেখানো হয়। আবার কেউ কেউ রাজনৈতিক প্রভাব ও হয়রানির আশঙ্কায় আইনি পদক্ষেপ নিতে সাহস পাচ্ছেন না বলে দাবি করেছেন।

অভিযোগ অস্বীকার, নথিপত্র নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার আশ্বাস

রাইয়ান বিল্ডিং টেকনোলজি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবুর রহমানের কাছে সব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় সব ডকুমেন্টস নিয়ে প্রতিবেদকের কার্যালয়ে হাজির হয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেবেন।

তবে প্রতিশ্রুতি দিয়েও তিনি সাক্ষাৎ করতে আসেননি। পরবর্তী সময়ে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

৫ নভেম্বর সকালে ও বিকেলে রাজধানীর বারিধারা আবাসিক এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় হিসেবে পরিচিত ঠিকানায় গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।

সব মিলিয়ে জমির শেয়ার ও ফ্ল্যাট বিক্রির নামে অর্থ গ্রহণ, চুক্তি বাস্তবায়ন না করা, অর্থ ফেরত না দেওয়া, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে প্রতারণার যেসব অভিযোগ সামনে এসেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এখন জরুরি। বিশেষ করে পাঁচ থানায় অভিযোগের প্রকৃত সংখ্যা, ব্যাংক লেনদেন, জমির দলিল, বায়না চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পদের উৎস যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভুক্তভোগীদের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।