সৌদি আরবে ফিরতে পারছেন না কর্মীরা, রিয়াদে আটকা প্রায় ৪ হাজার বাংলাদেশি। বিকল্প রুটের টিকিটের দাম কয়েক গুণ। ছবি: সংগৃহীত
ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফিরবেন—সব প্রস্তুতি সম্পন্ন, টিকিটও কাটা। পরিবারের সদস্যদের বিদায় জানিয়ে নির্ধারিত সময়ে হাজির হয়েছিলেন ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। কিন্তু সেখানে পৌঁছেই জানতে পারলেন, বাতিল হয়েছে ফ্লাইট। কবে আবার উড়োজাহাজ ছাড়বে, তারও নেই নিশ্চিত তথ্য। সৌদি আরবে কর্মস্থলে ফেরা নিয়ে এমন অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কুমিল্লার প্রবাসী রফিকুল ইসলামের মতো হাজারো যাত্রী।
রোববার দুপুরে বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে টিকিট হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন রফিকুল। চোখেমুখে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। বললেন, ‘হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছি। আমাকে যে কোনো মূল্যে সৌদি আরব যেতে হবে। সময়মতো যেতে না পারলে সমস্যায় পড়তে হবে। পরবর্তী ফ্লাইটের সিদ্ধান্ত জানানো হলে ভোগান্তি কিছুটা হলেও কমত।
রফিকুলের মতো অসংখ্য প্রবাসীর যাত্রা এখন অনিশ্চয়তার মুখে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার পর ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঢাকা থেকে রিয়াদগামী বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের অন্তত ১০টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। শনিবার রাত থেকে রোববার পর্যন্ত এসব ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় তিন হাজার যাত্রী। অন্যদিকে, ঢাকায় ফেরার অপেক্ষায় রিয়াদে আটকা পড়েছেন প্রায় চার হাজার বাংলাদেশি।
কবে আবার স্বাভাবিক হবে বিমান চলাচল, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকায় দুই দিকেই বাড়ছে প্রবাসীদের উদ্বেগ। কর্মস্থলে নির্ধারিত সময়ে যোগ দিতে না পারার আশঙ্কা, ভিসার মেয়াদ, নিয়োগকর্তার শর্ত এবং অতিরিক্ত যাতায়াত ব্যয়—সব মিলিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তাঁরা।
বিমানবন্দরে ছুটোছুটি, মিলছে না নিশ্চিত তথ্য
রোববার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়ে দেখা যায়, রিয়াদগামী যাত্রীরা টিকিট ও পাসপোর্ট হাতে নিয়ে এক কাউন্টার থেকে অন্য কাউন্টারে ছুটছেন। কেউ এয়ারলাইন্সের কাছ থেকে সর্বশেষ তথ্য জানার চেষ্টা করছেন, কেউ ফোনে পরিবারের সদস্যদের পরিস্থিতি জানাচ্ছেন। কিন্তু অধিকাংশেরই প্রশ্ন এক—কবে সৌদি আরবে যেতে পারবেন?
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বাস, মাইক্রোবাস কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় এসেছেন অনেকে। বিমানবন্দরে এসে ফ্লাইট বাতিলের খবর শুনে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তাঁরা। টিকিটের তারিখ পরিবর্তন, অর্থ ফেরত পাওয়া কিংবা বিকল্প ফ্লাইটে যাওয়ার সুযোগ—কোন প্রক্রিয়ায় কী করতে হবে, তা নিয়েও রয়েছে অস্পষ্টতা।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ যুগান্তরকে বলেন, সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলো ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের এ বিষয়ে অবহিত করছে। যাত্রীদের নিজ নিজ এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী যাত্রার বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে বিমানবন্দরে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
পাঁচ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বাতিল
বিমানবন্দর সূত্রে জানা যায়, শনিবার রাত থেকে রোববার পর্যন্ত ঢাকা থেকে রিয়াদগামী অন্তত ১০টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, সৌদিয়া, রিয়াদ এয়ার ও শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট।
অন্যদিকে, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় সেখানে আটকা পড়েছেন প্রায় চার হাজার বাংলাদেশি যাত্রী। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের ঘোষণায় বাংলাদেশ সময় ১২ অক্টোবর ভোর ৩টা পর্যন্ত ফ্লাইট পরিচালনা ও বিমান চলাচল বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়েছিল। ঢাকা-রিয়াদ রুটে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত ফ্লাইট বাতিল থাকায় যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা বিশ্বের বিভিন্ন এয়ারলাইন্সকে সৌদি আরবের আকাশসীমা ব্যবহার না করার বিষয়ে হুঁশিয়ারি দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে কেবল সরাসরি ফ্লাইট নয়, বিকল্প পথে সৌদি আরবে যাওয়ার পরিকল্পনাও অনিশ্চয়তায় পড়ছে।
বিকল্প রুটেও ভোগান্তি, বাড়ছে টিকিটের দাম
সরাসরি ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় অনেক প্রবাসী বিকল্প পথে সৌদি আরবে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কেউ ঢাকা-মদিনা, কেউ ঢাকা-জেদ্দা রুটের টিকিট খুঁজছেন। কেউ আবার ভারতের মুম্বাই হয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। কিন্তু বিকল্প রুটেও নিশ্চয়তা মিলছে না; উল্টো কয়েক গুণ বেড়ে গেছে টিকিটের দাম।
চাঁদপুরের রিয়াদ হোসেন ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের টিকিট কেটেছিলেন। ভারতের মুম্বাই হয়ে সৌদি আরবে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু সেই যাত্রাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ভারতের মুম্বাই হয়ে সৌদি আরবে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখন শুনছি, মুম্বাইয়ে যাদের ট্রানজিট, তাদের বোর্ডিং দেওয়া হচ্ছে না। মুম্বাই থেকে নাকি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
বিকল্প পথে যাওয়ার চেষ্টা করেও অনেকে এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান খুঁজে পাচ্ছেন না। একদিকে সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ, অন্যদিকে বিকল্প রুটের টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম—সব মিলিয়ে প্রবাসীদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
চাকরি, ভিসা ও থাকা-খাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা
সৌদি আরবে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকের জন্য নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে যোগ দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভিসার মেয়াদ, নিয়োগকর্তার বেঁধে দেওয়া সময়সীমা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক শর্তের কারণে তাঁরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে চাইছেন না। এ কারণে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে কেউ কেউ বাড়তি টাকা খরচ করে বিকল্প ফ্লাইটের টিকিট সংগ্রহের চেষ্টা করছেন।
তবে বিকল্প টিকিট সংগ্রহ করেও নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না তাঁরা। কোন রুটের ফ্লাইট কখন চালু হবে, যাত্রাপথে আবারও বাতিলের মুখে পড়তে হবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও অনিশ্চিত।
ফ্লাইট বাতিলের কারণে ঢাকায় থাকা-খাওয়ার খরচ নিয়েও নতুন করে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে। দূরবর্তী জেলা থেকে আসা যাত্রীদের সামনে এখন কঠিন সিদ্ধান্ত—ঢাকায় থেকে অপেক্ষা করবেন, নাকি বাড়ি ফিরে যাবেন? আবার বাড়ি ফিরে গেলে পরবর্তী ফ্লাইটের খবর পেয়ে নির্ধারিত সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছানো নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ।
সব মিলিয়ে রিয়াদগামী ফ্লাইট বাতিলের ঘটনায় সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসীদের যাতায়াত কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। একদিকে ঢাকায় আটকে থাকা কর্মীদের কর্মস্থলে ফেরার তাড়া, অন্যদিকে রিয়াদে আটকা পড়া যাত্রীদের দেশে ফেরার অপেক্ষা—দুই পক্ষই এখন তাকিয়ে আছেন বিমান চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার দিকে। কিন্তু কবে কাটবে এই অনিশ্চয়তা, তার নির্দিষ্ট উত্তর এখনো মিলছে না।
