নালিতাবাড়ী উপজেলার নাকুগাঁও স্থলবন্দরে কাজ করছেন শ্রমিকরা সমতল মাতৃভূমি
নদীভাঙনের ক্ষত বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা—এখানে জীবন মানেই সংগ্রাম। প্রতিটি সকাল যেন নতুন এক যুদ্ধের ডাক। সেই যুদ্ধে পুরুষের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নেমেছেন নারীরাও। কিন্তু সমান ঘাম ঝরিয়েও, সমান রোদে পুড়েও—তাদের প্রাপ্য থাকে অর্ধেকেই থেমে।
অভাবের সংসারে একটু স্বস্তির খোঁজে, সন্তানের মুখে দু’মুঠো ভাত তুলে দেওয়ার তাগিদে, লজ্জা-অভিমান সব ভুলে মাঠে নেমে পড়েন তারা। মরিচ তোলা, ভুট্টা কাটা, ভবন নির্মাণ,ধান ঘরে তোলা কিংবা আখের ক্ষেতে নুয়ে থাকা—কোনো কাজেই পিছিয়ে নেই নারী শ্রমিকরা। খেলা ধুলা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সব যায়গায় সমানভাবে এগিয়ে চলছে নারী সমাজ। অথচ দিনের শেষে হিসাব মেলাতে বসলে দেখা যায়, একই শ্রমে পুরুষ যেখানে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পান, সেখানে নারীর হাতে ওঠে মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
এই বৈষম্যের গল্প কেবল সংখ্যার নয়—এটি অপমানের, বঞ্চনার, আর নীরব প্রতিবাদের গল্প।
মোমেনা বেগমের চোখে সেই গল্প স্পষ্ট। স্বামী কখনও রিকশা চালান, কখনও দিনমজুরি করেন—তবু সংসারের চাকা থামে না। তাই তিনিও নেমেছেন মাঠে। ঠাট্টা-বিদ্রুপ শুনতে হয় প্রায়ই—মেয়ে মানুষ হয়ে এই কাজ?
কিন্তু তার কণ্ঠে নির্ভীক জবাব—কাম না কইল্লে খামু কী?
এই এক বাক্যেই যেন ধরা পড়ে হাজারো নারীর বাস্তবতা—অভিমান নেই, আছে শুধু বেঁচে থাকার লড়াই।
এদিকে পূর্ব কাজলাপাড়া আদর্শ গ্রামের মতো অসংখ্য গ্রামে একই চিত্র। ভূমিহীন পরিবার, অনিশ্চিত আয়, সঞ্চয় বলতে কিছু নেই। কাজ থাকলে ভাত, না থাকলে উপোস। তবু অভিযোগ জানানোর কেউ নেই—শুধু সময়ের কাছে নীরব আত্মসমর্পণ।
আবার মধ্যেরচরের আজিরন বেগমের কণ্ঠেও সেই ক্ষোভ—আমরা পুরুষের সমান কাজ করি, তবু অর্ধেক মজুরি পাই। নারী বলেই এই অবিচার।
অন্যদিকে নাকুগাঁও স্থলবন্দর-এও একই চিত্র। পাথর ভাঙার কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হাজারো শ্রমিকের বড় অংশই নারী। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পাথর ভেঙে ছামিরুন পান ৩২০ টাকা। এই সামান্য আয়ে সংসার চালানো মানে প্রতিদিন নতুন করে হেরে যাওয়া।
তার চোখে ক্লান্তি, কিন্তু হাল ছাড়ার ইচ্ছে নেই। কারণ পেছনে আছে দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ।
প্রচণ্ড রোদ, ধুলা, ঝুঁকি—সবকিছু উপেক্ষা করে কাজ করলেও নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা। নেই চিকিৎসা, নেই নিশ্চয়তা। অসুস্থ হলে ভরসা শুধু স্থানীয় হাতুড়ে ডাক্তার।
তবু জীবন থেমে থাকে না।
কারণ এই নারীরা জানেন— তাদের না থাকলে সংসারের চুলা জ্বলবে না।
প্রতি বছর মহান মে দিবস আসে, শ্রমিক অধিকারের কথা বলে, সমতার স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু দেওয়ানগঞ্জ কিংবা নাকুগাঁওয়ের এই নারীদের জীবনে সেই স্বপ্ন এখনো ধরা দেয় না।
তাদের গল্প যেন এক নিঃশব্দ প্রেমের মতো—সংসারের প্রতি, সন্তানের প্রতি, জীবনের প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতা। যেখানে ভালোবাসা আছে, ত্যাগ আছে, কিন্তু প্রাপ্য নেই।
তবে সমান কাজের ন্যায্য মজুরি—এই সহজ দাবিটুকু পূরণ হলেই হয়তো বদলে যাবে তাদের জীবন।
আর সেই দিনটির অপেক্ষায়, প্রতিদিন নতুন করে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আবারও মাঠে নামেন তারা—নিঃশব্দ, নিরলস, অবিচল।
