ফাইল ছবি : সংগৃহীত
দেশের জেলা হাসপাতালগুলোকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ ও সংস্কার প্রকল্পকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য এবং প্রভাবশালী একটি নেটওয়ার্কের অভিযোগে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও প্রকল্প পরিচালক নাফরিজা শ্যামা, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক, গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাঠের কারখানার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জুবায়ের বিন হায়দার এবং ঠিকাদার সাইদুল। যদিও অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবুও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট নথি, ঠিকাদারদের অভিযোগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন দিন দিন আরও জোরালো হচ্ছে।
সরকারের বৃহৎ এই স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন জেলা হাসপাতালের জন্য বিপুল পরিমাণ আসবাবপত্র, চিকিৎসা সহায়ক উপকরণ এবং অন্যান্য সরঞ্জাম সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পের একটি বড় অংশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় গণপূর্ত অধিদপ্তর। প্রায় ৩০০ কোটি টাকার আসবাবপত্র সংগ্রহ ও সরবরাহের দায়িত্ব গণপূর্তের ওপর ন্যস্ত করা হয়। পরবর্তীতে গণপূর্তের কাঠের কারখানা বিভাগ-১ ও বিভাগ-২ পৃথকভাবে দরপত্র আহ্বান করে।
কাঠের কারখানা বিভাগ-১ থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার আসবাবপত্র ক্রয়ের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দরপত্র মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ সম্পন্ন হওয়ার আগেই প্রকল্পের জন্য ১০০ কোটি টাকার বরাদ্দ অনুমোদন করা হয় সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী সাধারণত চুক্তি, কার্যাদেশ এবং কাজের অগ্রগতির সঙ্গে অর্থ ছাড়ের সম্পর্ক থাকলেও টেন্ডার চূড়ান্ত হওয়ার আগেই বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অর্থবছরের শেষ সময়ে দ্রুত অর্থ ছাড়ের মাধ্যমে বিল উত্তোলনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। আগামী ৩০ জুন অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই হিসাব নিষ্পত্তির চাপকে কাজে লাগিয়ে এই বরাদ্দ অনুমোদন করানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, নাফরিজা শ্যামার বিদেশ সফরের আগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অনুকূলে ১০০ কোটি টাকার বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই বরাদ্দের বিপরীতে কমিশন আদায়ের একটি সমঝোতা কাজ করেছে। গণপূর্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন নির্বাহী প্রকৌশলী বিভিন্ন ঠিকাদারের কাছে তিন শতাংশ হারে অর্থ দাবি করেন এবং প্রকল্প পরিচালকের নাম ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন ঠিকাদারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশে অবস্থানরত কর্মকর্তার কাছে ডলারে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
টেন্ডার প্রক্রিয়াও এখন প্রশ্নের মুখে। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, গত ৮ জুন পর্যন্ত আহ্বান করা ১২টি দরপত্রের মধ্যে ৮টিতে সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল হাতিল ফার্নিচার। সরকারি ক্রয়নীতিতে যোগ্যতা পূরণ সাপেক্ষে সর্বনিম্ন দরদাতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, হাতিলকে মাত্র একটি কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে এবং বাকি সাতটির সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণেই তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি মো. রেজাউল করিম গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত আবেদন করে দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি প্রকল্প পরিচালক, প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়া সত্ত্বেও কার্যাদেশ না দেওয়া সরকারি ক্রয়নীতির পরিপন্থী এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন সৃষ্টি করছে।
বিষয়টি পরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রীর নজরে আনা হলে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চান। পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গণপূর্তের কর্মকর্তারা দাবি করেন, দরপত্র প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়নি এবং সব কার্যক্রম সরকারি বিধি অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছে। মন্ত্রীকে দেওয়া সেই ব্যাখ্যাই পরবর্তীতে গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা যায়।
অন্যদিকে অভিযোগকারীদের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের দাবি, টেন্ডার মূল্যায়ন, কার্যাদেশ প্রদান এবং অর্থ বরাদ্দ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো এমনভাবে পরিচালিত হয়েছে যাতে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে। এ কারণেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও প্রকল্প পরিচালক নাফরিজা শ্যামা, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জুবায়ের বিন হায়দার এবং ঠিকাদার সাইদুলকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো কোনো স্বাধীন তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো এখনো উত্তরহীন—টেন্ডার চূড়ান্ত হওয়ার আগেই কেন ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলো? সর্বনিম্ন দরদাতাদের অভিযোগ কেন সৃষ্টি হলো? মূল্যায়ন প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল? কমিশন আদায়ের অভিযোগের পক্ষে বা বিপক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে? এসব প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ উত্তর ছাড়া পুরো প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ থেকেই যাবে।
স্বাস্থ্য খাতের কয়েকশ কোটি টাকার এই প্রকল্পে ওঠা অভিযোগগুলো শুধু প্রশাসনিক অনিয়মের প্রশ্ন নয়; রাষ্ট্রীয় অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার, প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়ব্যবস্থা এবং জনস্বার্থের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, প্রকল্পের সব নথি, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন, অর্থ বরাদ্দের অনুমোদন প্রক্রিয়া, বিল নিষ্পত্তির রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। এমন তদন্তের মাধ্যমেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই, দায় নির্ধারণ এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহারে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন তদন্তে চূড়ান্ত সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে স্বাধীন নিরপেক্ষ তদন্তে সত্যতা বেরিয়ে আসবে, এমনটাই ভাবছেন সংশ্লিষ্টরা।
