জি কে শামীমকে সাড়ে ১০ কোটি টাকার অগ্রিম বিল পাইয়ে দেওয়ার ঘটনায় দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এখন যশোর সার্কেলে; নতুন করে টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ। ফাইল ছবি
ক্যাসিনো কাণ্ডে বহুল আলোচিত মাফিয়া ঠিকাদার জি কে শামীমকে কাজ শেষ হওয়ার আগেই জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ১০ কোটি টাকা অগ্রিম বিল পাইয়ে দেওয়ার ঘটনায় দণ্ডপ্রাপ্ত গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফজলুল হক (মধু) আবারও আলোচনায়।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিনের আদেশে তার বিরুদ্ধে বেতন গ্রেড কমানোর যে শাস্তি কার্যকর হয়েছিল, সম্প্রতি তার মেয়াদ শেষ হয়েছে। আর এর পরপরই যশোর গণপূর্ত সার্কেলে পোস্টিং পেয়েই তিনি পুনরায় কোটি কোটি টাকার টেন্ডার বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাবেক এই বুয়েট ছাত্রলীগ নেতা ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা মির্জা আজমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ফজলুল হক বিগত দেড় দশকে অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক হয়েছেন। বর্তমানে আরও লোভনীয় পদায়নের আশায় তিনি বিভিন্ন মহলে তদবির চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের ১০ কোটি ৪৪ লাখ টাকার ‘উধাও বিল’
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে ফজলুল হক মধুর সময়েই জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠান শত শত কোটি টাকার কাজ পায়।
এর মধ্যে আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের ১৫ তলা ভবন নির্মাণ প্রকল্প অন্যতম। ২০১৯ সালে জি কে শামীম গ্রেফতারের পর প্রকল্পের চুক্তি বাতিল করে যৌথ পরিমাপ করা হলে দেখা যায়, সম্পাদিত কাজের প্রকৃত মূল্য ছিল ১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
অথচ অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকৌশলী ফজলুল হক ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুই দফায় ঠিকাদারকে ২৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করেন। অর্থাৎ, কাজ না করেই ১০ কোটি ৪৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা অতিরিক্ত উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থের বড় একটি অংশ বিভিন্ন মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
জালিয়াতি ধামাচাপা দিতে ‘তুঘলকি কাণ্ড’
২০২১ সালে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে অনিয়মের বিষয়টি উঠে এলেও অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি ধামাচাপা দিতে প্রশাসনিক জটিলতার আশ্রয় নেন।
তৎকালীন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার বসু এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. রোকন উদ্দিন ঘটনা জানার পরও ফজলুল হকের বিরুদ্ধে কোনো আইনি বা বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
একই বিষয়ে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার ২০২১ সালের মে ও জুন মাসে পৃথক শাখা থেকে দুটি ভিন্ন কমিটি গঠন করেন, যা গণপূর্তের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ‘তুঘলকি কাণ্ড’ হিসেবে সমালোচিত হয়।
অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. খাইরুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি মূল দায় নির্ধারণের পরিবর্তে অন্য প্রকল্পের ‘রিটেনশন মানি’ থেকে অর্থ সমন্বয়ের সুপারিশ করে পুরো ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
শাস্তির বদলে পদোন্নতি
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাসপেনশন বা কঠোর শাস্তির পরিবর্তে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও মন্ত্রণালয়ের চোখে ধুলো দিয়ে উল্টো পদোন্নতি পেয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হন ফজলুল হক মধু।
যশোর সার্কেলে ‘ওটিএম’ জালিয়াতি ও টেন্ডার উৎসব
যশোর সার্কেলে চলতি দায়িত্বে যোগ দেওয়ার পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নতুন করে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
যশোর, কুষ্টিয়া, নড়াইল, মাগুরা, মেহেরপুর ও ঝিনাইদহ জেলার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্রে নিয়মবহির্ভূত হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, যেসব কাজ এলটিএম (Limited Tendering Method) পদ্ধতিতে হওয়ার কথা ছিল, সেগুলোকে ওটিএম (Open Tendering Method)-এ রূপান্তরের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, এর মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে কোটি কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
বিশেষ করে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পের দরপত্রে ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সরিষাবাড়ী থেকে গণপূর্তের প্রভাবশালী কর্মকর্তা
জামালপুরের সরিষাবাড়ীর এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া ফজলুল হক মধু ২১তম বিসিএসের মাধ্যমে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদান করেন।
বুয়েটে অধ্যয়নকাল থেকেই ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। পরবর্তীতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের ঘনিষ্ঠতা ও লবিংয়ের মাধ্যমে তিনি ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিংগুলো পান বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া মিরপুর ডিভিশনে দায়িত্ব পালনকালে বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে উঠেছে।
উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি
দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলেও ফজলুল হক মধু এখনও গণপূর্ত অধিদপ্তরে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ।
তাদের দাবি, নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, টেন্ডার বাণিজ্য, অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন এবং বর্তমান কার্যক্রমের বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান পরিচালনা করা জরুরি।
তবে উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বা আদালতের চূড়ান্ত রায় এখানে উপস্থাপিত হয়নি; তাই অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণসাপেক্ষ।
সম্প্রতি এসব অনিয়মের অভিযোগে মেহেরপুর গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল হাসান এর বিরুদ্ধে ১৯ প্রকল্পে অনিয়মের তোলপাড় ‘শিরোনামে’ নিউজ প্রকাশিত হয়েছে। তবে রফিকুল হাসান এর কোন আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।এসব অনিয়মের বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। বিস্তারিত প্রকাশ পাবে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে………
