নথি গায়েব করে কর ফাঁকির অভিযোগ: উপকর কমিশনার লিংকন রায় চাকরি থেকে বরখাস্ত। ফাইল ফটো
নথি গায়েব করে সরকারের ১৪৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগে কর অঞ্চল-৫, ঢাকার উপকর কমিশনার লিংকন রায়কে চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তার বিরুদ্ধে নেওয়া চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিষয়টি জানানো হয়েছে।
নিষ্পত্তি করা কর আদেশ বদলে নতুন কর দাবি!
প্রজ্ঞাপন সূত্রে জানা যায়, লিংকন রায় কর অঞ্চল-৫-এর সার্কেল-৯০ (কোম্পানিজ)-এ কর্মরত থাকাকালে করদাতা প্রতিষ্ঠান ‘ধামসুর ইকোনমিক জোন লিমিটেড’-এর ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ করবর্ষের নিষ্পত্তিকৃত কর নির্ধারণ আদেশের বিপরীতে অসদুপায়ে নতুন আদেশপত্র তৈরি করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই নতুন আদেশের মাধ্যমে নতুন করে কর দাবি সৃষ্টি এবং পরবর্তীতে করের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় সরকারের বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতি হয়।
এ ঘটনায় ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করা হয়।
বিভাগীয় তদন্তে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সংশয়াতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর তাকে দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। তবে তার লিখিত জবাব কর্তৃপক্ষের কাছে সন্তোষজনক না হওয়ায় গুরুদণ্ড হিসেবে চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় একই বিধিমালার বিধি ৪(৩)(ঘ) অনুযায়ী লিংকন রায়ের বিরুদ্ধে চাকরি থেকে বরখাস্তের চূড়ান্ত আদেশ জারি করা হয়েছে।
আগেই সাময়িক বরখাস্ত, এবার চূড়ান্ত বিদায়
এর আগে ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট লিংকন রায়কে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। এবার বিভাগীয় তদন্ত ও পরবর্তী প্রক্রিয়া শেষে তাকে স্থায়ীভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলো।
তবে এখানেই শেষ নয়। ১৪৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকার কর ফাঁকির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলারও আসামি তিনি।
১৪৬ কোটি টাকার কর দাবি নেমে গেল শূন্যে!
দুদকের মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ করবর্ষে ধামসুর ইকোনমিক জোন লিমিটেডের বিপরীতে মোট কর দাবির পরিমাণ ছিল ১৪৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, কর্মকর্তা বদলির পর নতুন কর্মকর্তার মাধ্যমে নথিতে কর নির্ধারণী আদেশ পরিবর্তন ও পরিমার্জন করে কর দাবির পরিমাণ কমিয়ে যথাক্রমে শূন্য টাকা ও এক হাজার টাকা করা হয়।
অর্থাৎ, শত কোটি টাকার কর দাবি কার্যত নামিয়ে আনার মাধ্যমে বিপুল রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ তৈরি করা হয় বলে অভিযোগ।
শুধু করের হিসাব পরিবর্তন নয়, মূল কর নির্ধারণী আদেশের নথিও গায়েব করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দুদকের অভিযানেও সংশ্লিষ্ট মূল নথি খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
নথি গায়েব ও বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে লিংকন রায়সহ কর অঞ্চল-৫-এর তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন—
কর অঞ্চল-৫-এর সাবেক কর কমিশনার আবু সাঈদ মো. মুস্তাক
অতিরিক্ত কর কমিশনার গোলাম কবীর
উপকর কমিশনার লিংকন রায়
দুদকের অভিযোগ, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার কারণে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।
দুদকের অভিযানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য
গত ৯ জুলাই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর অঞ্চল-৫ থেকে নথিপত্র গায়েব করে ১৪৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকার কর ফাঁকির অভিযোগে এনফোর্সমেন্ট অভিযান চালায় দুদক।
অভিযানকালে অভিযোগের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এরপর বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের আওতায় আসে।
একদিকে বিভাগীয় তদন্তে অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত, অন্যদিকে একই ঘটনায় দুদকের মামলায় আসামি—সব মিলিয়ে উপকর কমিশনার লিংকন রায়ের চাকরিজীবনে নেমে এসেছে বড় ধরনের শাস্তির খড়্গ।
এখন প্রশ্ন—১৪৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকার এই বিপুল রাজস্ব ক্ষতির নেপথ্যে কারা, কীভাবে সরকারি নথি গায়েব হলো এবং করের শতকোটি টাকার দাবি কীভাবে শূন্য ও এক হাজার টাকায় নেমে এলো? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই দুদকের তদন্তের দিকে তাকিয়ে সংশ্লিষ্টরা।
