গুলশান-উত্তরায় বিপুল সম্পদের অনুসন্ধান, রাজউক ট্রেড সেন্টারে দুটি দোকান, বিতর্কিত পদোন্নতি ও পূর্বাচল প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ—সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি না হয়ে পালানোর অভিযোগ। ফারুক হোসেন মালুম এর বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগের প্রস্তুতি। ফাইল ছবি
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) এস্টেট পরিদর্শক ফারুক হোসেন মালুমের সম্পদের উৎস, পদোন্নতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গুলশান ও উত্তরার অভিজাত এলাকায় ৩৪টি ফ্ল্যাট এবং রাজউক ট্রেড সেন্টারে দুটি দোকানের মালিকানা নিয়ে প্রকাশিত সংবাদে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব সম্পদের পাশাপাশি পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ ঘিরে অনিয়ম, নথি গায়েব, ফাইল আটকে রাখা ও হয়রানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি একাধিক গণমাধ্যমে ‘রাজউকের এস্টেট পরিদর্শক ফারুক মালুমের হাতে আলাদিনের চেরাগ: গুলশান-উত্তরায় ৩৪ ফ্ল্যাট, রাজউক ট্রেড সেন্টারে ২ দোকান, বিতর্কিত পদোন্নতি’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এসব সংবাদ প্রকাশের পর ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি ঢাকা-৯ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রশিদ হাবিবের সঙ্গে তোলা নিজের একটি ছবি সাংবাদিকদের দেখিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
গুলশান-উত্তরায় বিপুল সম্পদের মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের ১ নম্বর রোডের ২১ নম্বর প্লটের ৫ নম্বর বাড়িতে ফারুক হোসেন মালুমের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু গুলশান নয়, উত্তরার বিভিন্ন সেক্টরেও তাঁর নামে ও বেনামে একাধিক আবাসিক সম্পত্তির তথ্য সামনে এসেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর রোডের ৪১ নম্বর বাড়িটি তাঁর মালিকানাধীন। এ ছাড়া উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ১৬ নম্বর রোডের ৫৫ নম্বর বাড়িতে তাঁর ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে চারটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। একইভাবে উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ১৪ নম্বর রোডের ১৪ নম্বর বাড়ির মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সব মিলিয়ে গুলশান ও উত্তরায় ৩৪টি ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে যে তথ্য সামনে এসেছে, তার প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস এবং সম্পদ অর্জনের বৈধতা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
রাজউক ট্রেড সেন্টারে দুটি দোকান নিয়েও আলোচনা
আবাসিক সম্পত্তির পাশাপাশি বাণিজ্যিক সম্পদ নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, রাজউকের মালিকানাধীন রাজউক ট্রেড সেন্টারে ফারুক হোসেন মালুম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক দোকান রয়েছে। বিশেষ করে ১৮ ও ৩৮ নম্বর দোকানের মালিকানা নিয়ে রাজউকের সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে।
একজন সরকারি কর্মচারীর পরিচিত আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। সম্পদগুলোর প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস এবং আয়কর নথি যাচাই করা হলে বিষয়টির প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
৫ আগস্টের পর বিতর্কিত পদোন্নতির অভিযোগ
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ফারুক মালুমের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের পর প্রশাসনিক অস্থিরতার সুযোগে তিনি নিজের প্রভাব কাজে লাগিয়ে দ্রুত পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম, জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার যথাযথ অনুসরণ হয়েছিল কি না, তা নিয়ে রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে তাঁর পদোন্নতির প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট নথি এবং প্রশাসনিক অনুমোদন যাচাই করা প্রয়োজন।
পূর্বাচল প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ ঘিরে সিন্ডিকেটের অভিযোগ
ফারুক হোসেন মালুমের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ ও হস্তান্তর প্রক্রিয়া ঘিরে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজউকের পলাতক কর্মকর্তা শেখ শাহিনুল ইসলামের প্রভাববলয়ে থেকে তিনি সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে একটি প্রভাবশালী চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ওই চক্রের বিরুদ্ধে একজনের নামে বরাদ্দ করা প্লট অন্যজনকে দেওয়ার চেষ্টা, প্লটসংক্রান্ত নথি গায়েব, ফাইল আটকে রাখা এবং প্লট হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে রাজউকের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় কথিত সিন্ডিকেটের ভূমিকা ও কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
সংবাদ প্রকাশের পর এমপির সঙ্গে ছবি দেখিয়ে সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর অভিযোগ
এদিকে ফারুক মালুমের সম্পদ ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর আচরণকে কেন্দ্র করে।
অভিযোগ রয়েছে, সংবাদ প্রকাশে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি ঢাকা-৯ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রশিদ হাবিবের পাশে দাঁড়িয়ে তোলা নিজের একটি ছবি সাংবাদিকদের দেখিয়ে প্রভাব বিস্তার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা করেন।
সাংবাদিকরা তাঁর বক্তব্য জানতে এবং অভিযোগের বিষয়ে ক্যামেরায় ভিডিও ধারণ করতে চাইলে তিনি দপ্তর ছেড়ে দ্রুত সরে যান বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি। তাঁর এভাবে চলে যাওয়ার দৃশ্য উপস্থিত অনেকেই দেখেছেন বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে সাংবাদিকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা কেন?
সাংবাদিক সমাজ ও সুশীল সমাজে ক্ষোভ
এমপির সঙ্গে তোলা ছবি প্রদর্শন করে সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক সমাজ, সুশীল সমাজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তার জবাব হওয়া উচিত তথ্য-প্রমাণ ও প্রশাসনিক জবাবদিহির মাধ্যমে। কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তিগত ছবি বা ঘনিষ্ঠতার পরিচয় দেখিয়ে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা গণতান্ত্রিক চর্চা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য ইতিবাচক নয়।
তাঁদের মতে, সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা বলছে। সে ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারী জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।
সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের রাষ্ট্র ও জনসেবকদের দায়িত্বসংক্রান্ত বিধানও সরকারি কর্মচারীদের জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকার বিষয়টি স্পষ্ট করে।
দুদকের তদন্তের দাবি উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে। ফারুক হোসেন মালুমের নামে ও বেনামে থাকা কথিত ৩৪টি ফ্ল্যাট, রাজউক ট্রেড সেন্টারের দুটি দোকান, সম্পদের উৎস, পদোন্নতির বৈধতা এবং পূর্বাচল প্রকল্পে প্লট বরাদ্দসংক্রান্ত অভিযোগগুলো আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব। পাশাপাশি অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বক্তব্য মেলেনি ফারুক হোসেন মালুমের: এ বিষয়ে এস্টেট পরিদর্শক ফারুক হোসেন মালুমের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলো নিয়ে অফিসে বসে কোনো কথা বলব না।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সম্পদ অর্জন, পদোন্নতি, পূর্বাচল প্রকল্পে অনিয়ম এবং সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর অভিযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা বা সুনির্দিষ্ট জবাব পাওয়া যায়নি। এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
প্রশ্ন এখন একটাই—একজন সরকারি কর্মচারীর সম্পদের প্রকৃত উৎস কী, আর দুর্নীতির অভিযোগের জবাব না দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের ছবি প্রদর্শনের মাধ্যমে কি জবাবদিহি এড়ানো সম্ভব?
আরো অনুসন্ধানী তথ্য নিয়ে বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে………
