কাস্টমস কর্মকর্তা ইরফান আলীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দুদকে। ইরফান আলী। ফাইল ছবি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব কর্মকর্তা মো. ইরফান আলীর বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার ফাইল আটকে রেখে শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে জিম্মি করা, ঘুষ আদায়, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নিজের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ গড়ে তোলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগে তাঁর সম্পদের উৎস অনুসন্ধান, ঘুষ লেনদেনের ঘটনা তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট সম্পদের বৈধতা যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ও জিরো টলারেন্স নীতির কথা বারবার ঘোষণা করা হলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এবার সেই অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে রাজস্ব কর্মকর্তা মো. ইরফান আলীর নাম।
বন্ডের ফাইল আটকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে জিম্মি করার অভিযোগ
দুদকে দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, কাস্টমস অ্যান্ড বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)-এ দায়িত্ব পালনকালে শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধাসংক্রান্ত বিভিন্ন ফাইল আটকে রেখে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে একপ্রকার জিম্মি করে রাখতেন ইরফান আলী। বন্ডেড লাইসেন্স নবায়ন, শুল্কমুক্ত কাঁচামাল ছাড়পত্র এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক অনুমোদনের নামে শিল্পমালিকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীর দাবি, ঘুষের অর্থ দিতে রাজি না হলে বিভিন্ন আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হতো। এমনকি প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ও পণ্য খালাসে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হতো। এতে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ করে ‘সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড (ইউনিট-১ গার্মেন্টস)’ এবং ‘রুপা প্যাকেজিং অ্যান্ড এক্সেসরিজ লিমিটেড’-এর মতো বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে কাস্টমস সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
কৃষক পরিবারের সন্তান, অল্প সময়েই বিপুল সম্পদের মালিক!
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে ইরফান আলীর পারিবারিক পরিচয় ও সম্পদের বিবরণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, তিনি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বেড়বাড়ী এলাকার বাসিন্দা মো. শমসের আলীর ছেলে। তাঁর বাবা একজন কৃষক। অথচ সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর অল্প সময়ের মধ্যেই ইরফান আলী নিজের পাশাপাশি স্ত্রী তুলি আক্তার ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মাগুরার ভায়নার মোড় এলাকায় স্ত্রী তুলি আক্তারের নামে প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয়ে ৫২ শতক জমি কেনা হয়েছে। একই এলাকায় নবনির্মিত একটি ১০ তলা বহুতল ভবনে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে অংশীদারত্বে অন্তত ২ কোটি টাকা বিনিয়োগের অভিযোগও রয়েছে।
উত্তরায় কোটি টাকার ফ্ল্যাট, ঝিনাইদহে একাধিক জমি
রাজধানীর অভিজাত এলাকাতেও রয়েছে তাঁর সম্পদের বিস্তার—এমন তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে। অভিযোগ অনুযায়ী, উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে প্রায় ১ হাজার ৬৬০ বর্গফুট আয়তনের একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন তিনি। ফ্ল্যাটটির আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঝিনাইদহ সদর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় শওকত ও মনিরের কাছ থেকে প্রায় ৬৬ লাখ টাকায় ৩ বিঘা জমি কেনার অভিযোগ রয়েছে। ৮১ নম্বর ও ১১০ নম্বর বিষয়খালি মৌজায় নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে আরও অন্তত ১০ বিঘা জমি থাকার তথ্যও অভিযোগে তুলে ধরা হয়েছে।
গ্রামেও বিলাসবহুল বাড়ি, স্বর্ণালংকার ও ব্যাংকে কোটি টাকা
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গ্রামের বাড়িতেও গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল আবাসন। একতলা বাড়িটির প্রতিটি কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ব্যবহারের তথ্য উল্লেখ করে অভিযোগকারী দাবি করেছেন, তাঁর জীবনযাত্রা ও ভোগবিলাসের ব্যয় ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
শুধু জমি ও ফ্ল্যাট নয়, ইরফান আলী এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সম্পদেরও অভিযোগ রয়েছে। দুদকে দেওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁদের নামে প্রায় ১০০ ভরি স্বর্ণালংকার, ৮০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং বিভিন্ন ব্যাংকে কয়েক কোটি টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ও নিয়মিত সঞ্চয় প্রকল্প (ডিপিএস) রয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস, ক্রয়মূল্য, অর্থের লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আয়কর নথি যাচাই করা হলে সম্পদের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, চাকরির পর বদলে যায় পরিবারের আর্থিক অবস্থান
অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে ইরফান আলীর গ্রামের বাড়িতে গেলে স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন তথ্য জানান।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বাবা একজন কৃষক। দীর্ঘদিন অভাব-অনটন ও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে ছেলেকে শিক্ষিত করে তুলেছেন। ইরফান আলী সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর পরিবারে সচ্ছলতা ফিরে আসে। তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে পরিবারের আর্থিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয়দের অনেকে।
তাঁদের দাবি, রাজধানী ঢাকা এবং শ্বশুরবাড়ি এলাকায় ইরফান আলীর বিপুল সম্পদ রয়েছে। একসময় আর্থিক সংকটে থাকা পরিবারটি বর্তমানে এলাকার অন্যতম বিত্তবান পরিবারে পরিণত হয়েছে বলেও স্থানীয়দের কেউ কেউ জানিয়েছেন।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি, দুদকের তদন্তের অপেক্ষা
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাজস্ব কর্মকর্তা মো. ইরফান আলীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর কাছে খুদেবার্তা (এসএমএস) পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুর্নীতির অভিযোগগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান ও তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবি
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তার আয়, চাকরির মেয়াদ, সম্পদ বিবরণী, আয়কর নথি এবং তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে অর্জিত সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে বন্ড সুবিধার ফাইল নিষ্পত্তি, লাইসেন্স নবায়ন, ছাড়পত্র প্রদান এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই সহজ হতে পারে।
তবে দুদকে দায়ের করা অভিযোগে উত্থাপিত ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়গুলো এখনো তদন্তে প্রমাণিত নয়। এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য গ্রহণ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
