গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. রফিকুজ্জামানের বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অন্তত ১১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং দেশে-বিদেশে বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর অভিজাত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় স্ত্রী ও বোনের নামে পাঁচটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, হবিগঞ্জ ও কুড়িগ্রামে দুটি পেট্রোল পাম্প এবং যুক্তরাষ্ট্রে বোনের নামে ফ্ল্যাট কেনাসহ বিপুল সম্পদের মালিকানা গড়ে তুলেছেন তিনি। সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের পাশাপাশি এসব সম্পদের অর্থের উৎস নিয়েও দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
পিডব্লিউডি ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির (বাপিডিপ্রকৌস) ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক রফিকুজ্জামানের বিরুদ্ধে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) এসব অভিযোগ জমা দিয়েছেন একই প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মচারী। গত ২৬ অক্টোবর দুদকে দাখিল করা অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, কাজের ব্যয় বাড়িয়ে বিল উত্তোলন এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তিন প্রকল্পে ১১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ।
অভিযোগকারীর দাবি, ঢাকায় সর্বশেষ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকালে মুগদা হাসপাতালের ভবন নির্মাণ ও সংস্কার, বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) নতুন ভবন নির্মাণ ও সংস্কার এবং পুলিশের বিভিন্ন ভবন নির্মাণকাজে অনিয়মের মাধ্যমে অন্তত ১১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পে কাজের প্রকৃত মান ও পরিমাণের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাবের অসংগতি, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং বিল পরিশোধে অনিয়মের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর প্রাক্কলন, দরপত্র, কার্যাদেশ, কাজের পরিমাপ, ভেরিয়েশন এবং বিল-ভাউচার পর্যালোচনা করা হলে কথিত অনিয়মের বিস্তারিত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। বিশেষ করে প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয়ের বিপরীতে বাস্তবে কতটুকু কাজ সম্পন্ন হয়েছে, তা সরেজমিন যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
সড়ক প্রকল্পে ২০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতির অভিযোগ
শুধু গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকল্প নয়, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পেও রফিকুজ্জামানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই প্রকল্পে ভেরিয়েশন বা কাজের পরিমাণ ও ব্যয় পরিবর্তনের সময় কয়েক গুণ বেশি দর দেখিয়ে সরকারের ২০ কোটি টাকারও বেশি আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এ ঘটনায় একপর্যায়ে তদন্ত শুরু হলেও প্রভাব বিস্তার ও উৎকোচের মাধ্যমে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পের মূল চুক্তি, সংশোধিত ব্যয়, ভেরিয়েশন অনুমোদন এবং চূড়ান্ত বিল পরীক্ষা করলেই এ বিষয়ে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
স্ত্রী-বোনের নামে পাঁচ ফ্ল্যাট, দুই পেট্রোল পাম্পের অভিযোগ
রফিকুজ্জামানের কথিত সম্পদের বিবরণ নিয়েও উঠেছে ব্যাপক প্রশ্ন। দুদকে দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় স্ত্রী ও বোনের নামে পাঁচটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন তিনি। এ ছাড়া নিজের জন্মস্থান হবিগঞ্জ এবং কুড়িগ্রামে দুটি পেট্রোল পাম্পের মালিকানার সঙ্গেও তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে এসব সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। তবে ফ্ল্যাট ও পেট্রোল পাম্পগুলোর প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হুন্ডিতে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ পাচারের অভিযোগ
দেশের বাইরে সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে রফিকুজ্জামানের বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ হুন্ডির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে। সেখানে তাঁর বোনের নামে একটি ফ্ল্যাট কেনা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন অভিযোগকারী।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের সম্ভাব্য পথ, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক লেনদেন, সম্পত্তি ক্রয়ের দলিল এবং অর্থের প্রকৃত উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন তদন্তের ফলাফল বা প্রামাণ্য নথি প্রকাশ্যে আসেনি।
যেখানেই দায়িত্ব, সেখানেই অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, পিডব্লিউডির বিভিন্ন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকালে রফিকুজ্জামানের বিরুদ্ধে সরকারি নির্মাণ ও সংস্কারকাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি তাঁকে হবিগঞ্জে বদলি করা হয়েছে।
তাঁর দায়িত্ব পালনকালে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর দরপত্র, কার্যাদেশ, প্রকল্প ব্যয়, ভেরিয়েশন, বিল-ভাউচার এবং কাজের বাস্তব অগ্রগতি যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরূপণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য, আয়কর নথি এবং সম্পদ অর্জনের সময়কাল পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
দুদকে অভিযোগ, যাচাই-বাছাইয়ের দাবি
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগের বিষয়ে সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। শিগগিরই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ডেকে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ও ব্যাখ্যা চাওয়া হতে পারে।
তবে অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় শুধু প্রাথমিক যাচাই নয়, প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে। বিশেষ করে ১১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, সড়ক প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে সরকারের ২০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতির অভিযোগ এবং দেশে-বিদেশে কথিত সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে দুদকের কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন অভিযোগকারী।
সরকারি প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, প্রকল্পের কাজের সঙ্গে উত্তোলিত বিলের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না এবং প্রকৌশলীর পরিবারের নামে থাকা সম্পদের অর্থের উৎস কী—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথিপত্র ও সম্পদের মালিকানা যাচাই জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি: প্রকৌশলী মো. রফিকুজ্জামানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। তাঁর কাছে পাঠানো খুদে বার্তারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
উল্লেখ্য, দুদকে অভিযোগ জমা পড়া মানেই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়া নয়। এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণ করা প্রয়োজন।
