রাজধানীতে ৫৩টি ফ্ল্যাট, শতকোটি টাকার ভবন, পূর্বাচলে একাধিক প্লট, শেয়ারবাজারে বিপুল বিনিয়োগ, নিজ জেলায় কলেজ, বহুতল ভবন ও হাজার হাজার শতাংশ জমি—এই বিপুল সম্পদের অনুসন্ধান প্রকাশ্যে আসার পরই দেশ ছেড়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আলোচিত সাবেক সদস্য ড. সহিদুল ইসলাম। অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম এশিয়া পোস্ট দাবি করেছে, সম্পদ নিয়ে তাদের তদন্তের বিষয়টি জানতে পেরেই তিনি গত ২৫ মে দেশ ত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি স্ত্রী-সন্তানসহ মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর সরকারি মহলেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) তার সম্পদের উৎস নিয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
একের পর এক অনুসন্ধান, তারপরই বিদেশে পাড়ি
দীর্ঘ অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এশিয়া পোস্ট প্রথমে গত ১ জুন ‘এনবিআরের সহিদুলের ঢাকায় ৫৩ ফ্ল্যাট, ৪০০ কোটির সম্পত্তি’ এবং পরে ১৪ জুলাই ‘এনবিআরের সহিদুলের গ্রামেও ১০০ কোটির সম্পত্তি, ৫ হাজার শতাংশ জমি’ শিরোনামে দুটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনগুলোতে সহিদুল ইসলাম, তার স্ত্রী ফাহমিদা রাখী, ছেলে ফারহান ইসলাম এবং ঘনিষ্ঠ স্বজনদের নামে-বেনামে থাকা প্রায় ৫০০ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য তুলে ধরা হয়।
সহিদুলের ছবি সংগৃহীত
রাজধানীজুড়ে সম্পদের পাহাড়—ফ্ল্যাট, প্লট, ভবন ও কোটি টাকার বিনিয়োগ
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সহিদুল ইসলামের নামে বা তার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে—
ঢাকায় ৫৩টি ফ্ল্যাট
পূর্বাচলে ৬টি প্লট, আনুমানিক মূল্য ৬২ কোটি টাকা
বসুন্ধরা আবাসিকে শতকোটি টাকার ভবন
নিউমার্কেট ও আজিজ সুপার মার্কেটে একাধিক দোকান
মধুমতি মডেল টাউনে প্রায় ১০ কোটি টাকার বাংলো
শেয়ারবাজারে প্রায় ৮০ কোটি টাকার বিনিয়োগ
বিভিন্ন স্থানে আরও বিপুল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ
অন্যদিকে নিজ জেলা বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে বাবার নামে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে কলেজ, ৫ হাজারের বেশি শতাংশ জমি এবং খুলনা শহরে বহুতল ভবনের তথ্যও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
বক্তব্য চাওয়ার দুই দিনের মাথায় দেশ ছাড়লেন
একাধিক গণমাধ্যমের তথ্য জানায়, প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশের আগে ২৩ মে সহিদুল ইসলামের বক্তব্য নিতে তার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসায় যান কয়েক জন গণমাধ্যম কর্মী।
তবে নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন না।
এর মাত্র দুই দিন পর, অর্থাৎ ২৫ মে, তিনি দেশ ছেড়ে ব্যাংককের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
ট্রাভেল ডকুমেন্টে মিলেছে বিদেশযাত্রার তথ্য
সাম্প্রতিক গণমাধ্যমের হাতে আসা ট্রাভেল ডকুমেন্ট অনুযায়ী, ২৫ মে সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে থাই এয়ারওয়েজের TG-322 ফ্লাইটে ব্যাংককের উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করেন সহিদুল ইসলাম।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এরপর তিনি আর দেশে ফেরেননি এবং বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন।
পরিবারকেও বিদেশে পাঠানোর দাবি
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সম্পদের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর সম্ভাব্য আইনি জটিলতার আশঙ্কায় সহিদুল ইসলাম তার স্ত্রী ফাহমিদা রাখী ও ছেলে ফারহান ইসলামকেও দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে বলেন। পরবর্তীতে তারাও মালয়েশিয়ায় চলে যান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাত মাসে চারবার বিদেশ সফর
ট্রাভেল রেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত সাত মাসে তিনি একই পাসপোর্ট ব্যবহার করে চারবার আন্তর্জাতিক সফর করেছেন।
এর মধ্যে রয়েছে—
. ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব সফর।
. নেপাল সফর এবং ভারত হয়ে দেশে ফেরা।
. মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে দুই সপ্তাহের সফর।
. সর্বশেষ ২৫ মে ব্যাংকক হয়ে বিদেশ গমন।
দুদক ও এনবিআরের অনুসন্ধান শুরু
এশিয়া পোস্টের দাবি অনুযায়ী, প্রতিবেদন প্রকাশের পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) সহিদুল ইসলামের সম্পদের উৎস, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে।
সহিদুল ইসলাম এনবিআরের ১৩তম ব্যাচের কর্মকর্তা ছিলেন। অবসরের আগে তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
