বৃহস্পতিবার, ৯ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অস্তিত্বহীন অফিসে ৩১১ কর্মকর্তার পদায়ন, ১০ মাসেও নেই অফিস, নেই বেতন—’চাকরি আছে, কিন্তু কর্মস্থল নেই’

আবদুর রহমান
জুলাই ৯, ২০২৬ ১২:২১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সরকারি চাকরি আছে, পদোন্নতিও হয়েছে। বদলির আদেশ হাতে পেয়েছেন, নতুন কর্মস্থলেও যোগ দিয়েছেন। অথচ নেই কোনো অফিস, নেই দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকা, নেই সহকর্মী, নেই গাড়ি, এমনকি মাসের পর মাস মিলছে না বেতন-ভাতাও। অবিশ্বাস্য হলেও এ বাস্তবতার মধ্যেই দিন কাটছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নবসৃষ্ট পদে পদায়ন পাওয়া শতাধিক কর্মকর্তার।

অভিযোগ উঠেছে, প্রয়োজনীয় অফিস, অফিস কোড, আইবাস কোড ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রস্তুত না করেই ৩১১টি নবসৃষ্ট পদে পদোন্নতি ও পদায়ন দেওয়া হয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে কর্মস্থল থাকলেও বাস্তবে সেই অফিসের কোনো অস্তিত্ব নেই। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যেমন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন, তেমনি থমকে আছে উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ কাজও।

ঢাকা ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সানাউল্লাহকে গত বছরের আগস্টে বদলি করা হয় শেরেবাংলানগর গণপূর্ত বিভাগ-৪-এ। প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি এখনও নিজের অফিস খুঁজে পাননি। কোন এলাকা তার দায়িত্বে, সেটিও জানানো হয়নি। নেই উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী, নেই স্টাফ অফিসার, নেই কোনো সহায়ক জনবল। অফিস কোড না থাকায় তার বিভাগের টেন্ডার ও উন্নয়ন কাজ এখনো পরিচালিত হচ্ছে শেরেবাংলানগর গণপূর্ত বিভাগ-১ থেকে। অথচ তিনি দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতাও পাচ্ছেন না।

একই চিত্র মো. আনোয়ার হোসেনের ক্ষেত্রেও। জাতীয় সংসদ ভবনসহ শেরেবাংলানগর এলাকার দায়িত্বে থাকা এই নির্বাহী প্রকৌশলীকে চলতি বছরের মার্চে বদলি করা হয় ইএম ডিভিশন-১২-এ। কিন্তু সেই অফিসের কোনো অস্তিত্বই নেই। নেই দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকা, নেই স্টাফ, নেই গাড়ি। মাঝেমধ্যে পূর্ত ভবনের সংস্থাপন বিভাগে হাজিরা দেওয়া ছাড়া তার আর কোনো কাজও নেই। বেতন-ভাতাও বন্ধ।

শুধু এই দুই কর্মকর্তা নন—এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন আরও শত শত কর্মকর্তা। নবসৃষ্ট সার্কেল-৫-এর অধীনে ঢাকা ডিভিশন-৫ নামে একটি বিভাগ থাকলেও বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। অথচ সেখানে কর্মকর্তাদের পদায়ন দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে প্রকল্প ও ভবন নির্মাণ বেড়ে যাওয়ায় ২০২৫ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নতুন সাংগঠনিক কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। নানা প্রক্রিয়া শেষে গত বছরের ৭ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ৩১১টি নতুন পদ সৃজনে সম্মতি দেয়। কিন্তু পদ অনুমোদনের পর প্রয়োজনীয় অফিস, অফিস কোড, আইবাস কোড কিংবা প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি না করেই পদোন্নতি ও পদায়ন সম্পন্ন করা হয়।

এর ফলেই এখন নবসৃষ্ট পদে যোগদানকারী কর্মকর্তারা মাসের পর মাস বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। আইবাস কোড না থাকায় টেন্ডার আহ্বান, উন্নয়ন ও সংস্কার কাজও চালানো যাচ্ছে না। অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প কার্যত স্থবির হয়ে রয়েছে।

এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, অফিস কোড ও আইবাস কোড সৃষ্টির বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে চেষ্টা চলছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

সূত্র জানায়, নবসৃষ্ট পদগুলোর মধ্যে বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের ১০৭টি পদ রয়েছে। এর মধ্যে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ও সহকারী প্রকৌশলীর বিভিন্ন পদ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বাকি পদগুলো নন-ক্যাডার থেকে অফিস সহায়ক পর্যন্ত বিস্তৃত।

চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ১৯টি নতুন অফিসের আইবাস কোড সৃষ্টির অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠালেও দীর্ঘ পাঁচ মাসেও কার্যকর কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যেমন বেতন পাচ্ছেন না, তেমনি নতুন অফিসগুলোও কার্যক্রম শুরু করতে পারছে না।

অভিযোগ রয়েছে, পদোন্নতি ও বদলিতে দ্রুততা দেখালেও নতুন অফিসগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকা নির্ধারণ, জনবল, লজিস্টিক সাপোর্ট, আসবাবপত্র ও যানবাহনের ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে চরম অবহেলা করা হয়েছে।

বিসিএস গণপূর্তের ১৫ ব্যাচের কর্মকর্তা মো. কায়কোবাদ পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চট্টগ্রাম) হয়েছেন। কিন্তু ছয় মাসের বেশি সময় ধরে তার নেই কোনো অফিস, নেই কোনো ব্যবস্থাপনা, এমনকি নেই বেতন-ভাতাও। অবসরের মাত্র কয়েক মাস আগে এমন পরিস্থিতিতে তিনি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

একই অবস্থা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোস্তফা কামালের। নবসৃষ্ট সার্কেল-৫-এ পদায়ন পেলেও অফিস না থাকায় তিনি বাধ্য হয়ে মহাখালী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষে বসছেন। কিন্তু অফিস কোড না থাকায় কোনো প্রশাসনিক কাজই করতে পারছেন না। এতে একই কক্ষে কাজ করতে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, আমাদের চাকরি আছে, কিন্তু কর্মস্থল নেই। অফিস নেই, কাজ নেই, গাড়ি নেই, এমনকি পরিবার চালানোর জন্য বেতনটুকুও নেই। এই পোস্টিং আমাদের মানসিক ও পারিবারিকভাবে ভেঙে দিয়েছে।

আরেক কর্মকর্তা বলেন, আগে অফিস, অফিস কোড, জনবল ও লজিস্টিক নিশ্চিত করা উচিত ছিল। এরপর পদায়ন করলে আজ এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।

অস্তিত্বহীন অফিসে শত শত কর্মকর্তার পদায়ন, মাসের পর মাস বেতন বন্ধ এবং উন্নয়ন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার এই ঘটনা এখন গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রশাসনিক সমন্বয় ও পরিকল্পনা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।