সমঝোতা ব্যর্থ হয়ে ভাড়া করা হয় সন্ত্রাসী, হামলার আগে ১৪ জনের বৈঠক। ছবি: বিকাশ চন্দ্র সরকার
রাজধানীর ইসিবি চত্বরে নিউ গিনি প্রপার্টি আবাসন প্রকল্পে সশস্ত্র হামলার ঘটনায় বিকাশ চন্দ্র সরকার নামে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশের দাবি, তিনি ওই হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী। রোববার গভীর রাতে মাগুরা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিবির এক কর্মকর্তা সোমবার গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একটি সূত্র জানায়, হামলার আগে বিকাশ ওই আবাসন প্রকল্পের চেয়ারম্যান নাজিমুদ্দিন ভূঁইয়া, সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ জমির মালিকদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেন। সমঝোতা না হওয়ায় মামলার এক নম্বর আসামি শাহরিয়া মাহমুদের কাছে হামলার জন্য সন্ত্রাসী ভাড়া করে দেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
হামলার আগে ১৪ জনের বৈঠক
তদন্তে উঠে এসেছে, হামলার প্রায় সাড়ে আট ঘণ্টা আগে ইসিবি চত্বর এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় বৈঠক করেন শাহরিয়া মাহমুদ ও মামলার দুই নম্বর আসামি ক্যান্টনমেন্ট থানা জামায়াতে ইসলামীর রুকন আবুল কাশেমসহ ১৪ জন।
তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের হাতে ওই বৈঠকের ছবি এসেছে। সেখানে বিকাশ কুমার নামে একজন ঠিকাদারকেও শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্ত সূত্র জানায়, বৈঠকের ছবিতে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রথমে শাহরিয়া মাহমুদ গ্রেপ্তার হন। আরও কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। রোববার রাতে বিকাশ কুমারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ছয় আসামিকে ডিবিতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ
হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার ছয়জনকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কারাগার থেকে মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। রোববার তাদের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
তারা হলেন—শাহরিয়া মাহমুদ, মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ নেতা শাহ আলম অনিক, কুষ্টিয়া-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) মো. আব্দুর গফুরের জামাতা মিজানুর রহমান, ভাসানটেক বস্তির বাসিন্দা মো. মামুন, মো. মুন্না ও অটোরিকশাচালক আসলাম।
ডিবির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার আ ফ ম আনোয়ার হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেন, ছয় আসামিকে ডিবিতে আনা হয়েছে। হামলার ঘটনায় তাদের বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
এদিকে তিন দিনের রিমান্ড শেষে রোববার মামলার চার নম্বর আসামি মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে আদালতে হাজির করে ডিবি। পরে আদালত তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন।
অন্তত ৫০টি গুলি, আতঙ্কে শ্রমিক-নিরাপত্তাকর্মীরা
পুলিশ জানায়, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাত সোয়া ১১টার দিকে নিউ গিনি আবাসন প্রকল্প ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে সশস্ত্র হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। আতঙ্ক ছড়াতে হামলাকারীরা এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, হামলাকারীরা ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে আবাসন প্রকল্পে প্রবেশ করে। হামলায় অন্তত ৫০টি গুলি ছোড়া হয়। এতে নির্মাণশ্রমিক, নিরাপত্তাকর্মী ও আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
হামলায় অনেক তরুণকে অংশ নিতে দেখা যায়। ঘটনাস্থল ও ঘটনার পর গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন বস্তির বাসিন্দা ও অটোরিকশাচালক বলে জানা গেছে। পুলিশ বলছে, তাদের ভাড়া করে হামলায় আনা হয়েছিল।
হামলা সমন্বয়ের অভিযোগ শাহরিয়ার মাহমুদের বিরুদ্ধে
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার পুরো ঘটনা সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক মাদ্রাসাশিক্ষক শাহরিয়া মাহমুদ। হামলার আগে তাঁর নেতৃত্বে বৈঠক এবং পরবর্তী সময়ে হামলাকারীদের তৎপরতার বিষয়টি তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
এখন তদন্তকারীদের নজরে হামলার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিরা, আগের বৈঠকে অংশ নেওয়া অন্য সদস্য এবং হামলাকারীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের বিষয়গুলো। বিকাশ চন্দ্র সরকারকে গ্রেপ্তারের পর এই হামলার পরিকল্পনা ও অর্থায়নের বিষয়ে আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা।
তবে এসব অভিযোগ তদন্তাধীন; আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
