ছবি- এপি
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার কথা জানিয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। দলটির দাবি, এর মাধ্যমে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন খর্ব করা হয়েছে। অন্যদিকে কেন্দ্রের বক্তব্য, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় প্রাদেশিক সরকার ব্যর্থ হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত রোববার প্রদেশটির নির্বাচিত সরকার স্থগিত করে গভর্নরের শাসন জারি করে কেন্দ্র। এ সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে গতকাল মঙ্গলবার আদালতে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন পিটিআইয়ের কেন্দ্রীয় তথ্য সচিব শেখ ওয়াকাস আকরাম। মহাসচিব সালমান আকরাম রাজার নেতৃত্বে একটি কমিটি ইতোমধ্যে রিটের খসড়া তৈরি করেছে বলেও জানান তিনি।
তিন বছরের বেশি সময় ধরে কারাবন্দি ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পিটিআই যখন ইসলামাবাদ অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করে, তখন কেন্দ্রের এই পদক্ষেপ পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। স্থগিত মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি ও তাঁর মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলে সোমবার জানান অভ্যন্তরীণবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী। তবে পিটিআই নেতারা জানিয়েছেন, তাদের আন্দোলন চলবে।
‘কেন্দ্রের পদক্ষেপ স্বায়ত্তশাসনে হস্তক্ষেপ’
২০১৩ সাল থেকে প্রদেশটি শাসন করে আসছিল পিটিআই। কেন্দ্রীয় সরকারের ঘোষণায় বলা হয়, আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী এই প্রদেশে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াইয়ের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন ছিল।
রাজনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব লেজিসলেটিভ ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সির (পিআইএলডিএটি) যুগ্ম পরিচালক আসিয়া রিয়াজ বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই থেকে প্রাদেশিক সরকার সরে দাঁড়িয়েছে, কেন্দ্রের এই অভিযোগ জরুরি অবস্থা জারির সাংবিধানিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে এই যুক্তির বিরোধিতা করেছেন লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেসের শিক্ষক ও আইনজীবী হাসান আবদুল্লাহ নিয়াজি। তাঁর মতে, প্রদেশে কার্যকর আইনসভা ও প্রশাসন ছিল এবং তারা জনগণের আস্থাও অর্জন করেছিল। তাই কেন্দ্রের পদক্ষেপকে তিনি প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর অসাংবিধানিক হস্তক্ষেপ বলে মনে করেন।
কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার অভিযোগ করেন, প্রদেশে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য পিটিআই সরকার দায়ী। তিনি দলটির সঙ্গে পাকিস্তান তালেবান (টিটিপি) ও আফগান তালেবানের যোগসাজশের অভিযোগও তোলেন।
মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগে বিঘ্ন
নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করায় খাইবার পাখতুনখোয়ার বিভিন্ন এলাকায় জনজীবন ব্যাহত হয়েছে। পেশোয়ারের বিভিন্ন সড়কে পণ্যবাহী কনটেইনার দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে। পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি মোবাইল ফোনের সেবা বন্ধ ও ইন্টারনেট সংযোগে বিঘ্ন ঘটায় ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা। সোমবার বন্ধ রাখা হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও।
গতকাল মঙ্গলবার তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার দাবি করেন, খাইবার পাখতুনখোয়ার মানুষ গভর্নরের শাসনকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আটক ও ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হওয়ার খবরে উদ্বেগ জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ মানবাধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা।
আইনি লড়াইয়ের ভিত্তি
প্রাদেশিক পরিষদের প্রস্তাব ছাড়াই জরুরি অবস্থা জারি করায় ১০ দিনের মধ্যে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে এর অনুমোদন নিতে হবে। প্রয়োজনীয় সংসদীয় অনুমোদন সাপেক্ষে গভর্নরের শাসন সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত বহাল রাখা যেতে পারে। পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান গওহর আলি খান জানিয়েছেন, জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালত ও পার্লামেন্টে চ্যালেঞ্জ জানাবে তাঁর দল।
এখন পিটিআইয়ের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা, সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখা এবং আদালতে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বৈধতার প্রশ্নে লড়াই করা। অন্যদিকে, শাহবাজ শরিফের সরকারকে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর পাশাপাশি প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও নাগরিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগের জবাব দিতে হবে। আগামী কয়েক সপ্তাহে আদালতের পদক্ষেপ, সংসদীয় অনুমোদন এবং প্রদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্পষ্ট করবে এই সিদ্ধান্ত কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ায়, নাকি দুপক্ষের বিরোধ আরও দীর্ঘায়িত করে।
