শনিবার, ৩০শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ঈদের হাট শেষে ফিরছে ট্রাকে ট্রাকে গরু, অবিক্রীত ২২ লাখের বেশি, পশুতে খামারি–ব্যাপারীদের কান্না

স্টাফ রিপোর্টার
মে ৩০, ২০২৬ ৯:০৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

‘গরুর সঙ্গে আমরাও কোরবানি হয়ে গেছি’—হাটজুড়ে খামারিদের হাহাকার। ফাইল ছবি

ঈদুল আজহার কোরবানির হাট শেষ হয়েছে, কিন্তু শেষ হয়নি খামারি ও পশু ব্যবসায়ীদের হতাশা। দেশের বিভিন্ন পশুর হাট থেকে এখনো ট্রাকে ট্রাকে ফিরছে অবিক্রীত গরু। রাজধানীর গাবতলী, কমলাপুর, দিয়াবাড়ীসহ বড় বড় হাটে ঈদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দেখা গেছে বিক্রির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য গরু। কাঙ্ক্ষিত দাম তো দূরের কথা, অনেকেই লোকসান গুনে পশু বিক্রি করেছেন, আবার অনেকে গরু ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার। এর মধ্যে ১ কোটির কিছু বেশি পশু কোরবানি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে প্রায় ২২ থেকে ২৩ লাখ পশু অবিক্রীত থেকে গেছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

খামারি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, বড় গরুর চাহিদা কমে যাওয়া, সীমান্ত দিয়ে ভারত ও মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে পশু প্রবেশ এবং কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে হাটের বিরূপ পরিবেশ—সব মিলিয়ে এবারের বাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে।

বড় গরুর খামারিদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি-

এবার সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছেন বড় গরুর খামারিরা। রাজধানীর বিভিন্ন পশুর হাটে বড় গরু নিয়ে আসা অনেকেরই ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ পশু অবিক্রীত রয়ে গেছে। কেউ কেউ প্রতি গরুতে এক লাখ টাকারও বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

বগুড়া সদর থেকে ২৫টি গরু নিয়ে গাবতলী হাটে এসেছিলেন খামারি মাহবুব হোসেন। বিক্রি করতে পেরেছেন মাত্র ১৭টি।

তিনি বলেন, সব গরুই বড় ছিল। একেকটির পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। কিন্তু ঢাকায় এনে অনেক গরু ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। লাভ তো দূরের কথা, বড় ধরনের লোকসান গুনতে হয়েছে।

মানিকগঞ্জের ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাকের কণ্ঠেও একই হতাশা। তিনি বলেন, ৫০টি গরু এনেছিলাম, বিক্রি হয়েছে মাত্র ১৮টি। বাকিগুলো ফিরিয়ে নিতে হচ্ছে। এবার মনে হচ্ছে গরুর সঙ্গে আমরাও কোরবানি হয়ে গেছি।

আব্দুস সাত্তার নামে আরেক ব্যবসায়ী জানান, ৪০টি গরুর মধ্যে ২০টি বিক্রি হয়নি। ঈদের দুই দিন আগে যে গরুর দাম ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল, সেটি শেষ পর্যন্ত ২ লাখ ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে।

“ঋণ করে গরু কিনেছি। দেনা শোধ করার জন্যই কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি,  বলেন তিনি।

খরচের বোঝা, নেই লাভের দেখা-

দিনাজপুর থেকে ৮০টি গরু নিয়ে গাবতলী হাটে এসেছিলেন ব্যবসায়ী মামুন। চারটি ট্রাকে গরু পরিবহনে তাঁর খরচ হয়েছে ৮০ হাজার টাকা। সঙ্গে ছিলেন ১১ জন শ্রমিক।

তিনি বলেন,  খাওয়া, থাকা, গোসল, টয়লেট—সবকিছুর পেছনে টাকা গেছে। কিন্তু লাভ তো হয়নি, উল্টো খরচই বেড়েছে। ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত কোনো গরু বিক্রি করতে পারিনি। এখন বাধ্য হয়ে সব গরু বাড়িতে ফিরিয়ে নিচ্ছি।

কুষ্টিয়া থেকে কমলাপুর অস্থায়ী পশুর হাটে ৩০টি গরু নিয়ে এসেছিলেন মো. সোহেল আলী। প্রায় ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন ১০ জন মিলে।

তিনি বলেন,  মাত্র দুটি গরু বিক্রি হয়েছে। বাকি ২৮টি গরু আবার গ্রামে ফিরিয়ে নিতে হয়েছে। শুধু ফেরত নেওয়ার ট্রাক ভাড়াই লেগেছে ৩৩ হাজার টাকা।

কুষ্টিয়ার মিরপুরের এক ব্যবসায়ী জানান, দুটি গরু বিক্রি করেই তাঁর এক লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। বাকি দুটি গরুর দাম ক্রেতারা এক লাখ টাকা বললেও তিনি কিনেছিলেন দেড় লাখ টাকা করে।

এভাবে বিক্রি করলে পুরো পুঁজি শেষ হয়ে যাবে। তাই গরু ফিরিয়ে নেওয়াই ভালো মনে করেছি, বলেন তিনি।

ছোট ও মাঝারি গরুতেই ছিল ক্রেতাদের আগ্রহ

মানিকগঞ্জ, পাবনা, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও যশোরসহ বিভিন্ন জেলার খামারি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা তুলনামূলক বেশি ছিল। অন্যদিকে বড় গরুর ক্রেতা ছিল খুবই কম।

ফলে বড় খামারিদের ক্ষতির পরিমাণও বেশি হয়েছে। ঢাকায় গরু এনে রাখা, শ্রমিক ব্যয়, খাদ্য, হাটের ফি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে অনেকের কয়েক লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। এখন অবিক্রীত গরু আবার খামারে ফিরিয়ে নেওয়ায় খাদ্য ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচও বাড়বে।

ঋণের চাপ, অনিশ্চয়তার শঙ্কা-

খামারিদের আশঙ্কা, আগের ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে নতুন করে ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। অন্যদিকে গোখাদ্যের দামও এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, যা তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি নিলয় হোসেন বলেন, “মানুষের আর্থিক অবস্থা আগের মতো নেই। ফলে কোরবানির সংখ্যা প্রত্যাশার তুলনায় কম হয়েছে। বড় গরুর বাজার প্রায় ভেঙে পড়েছে।

তিনি জানান, দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ কোরবানিতে ছোট গরু ব্যবহৃত হয় এবং এসব পশুর প্রধান উৎপাদক প্রান্তিক খামারিরা। তাঁদের উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম। বিপরীতে বড় করপোরেট খামারগুলোর খরচ বেশি হওয়ায় তারা বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে।

যা বলছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর-

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান বলেন, কোরবানি হওয়া পশুর চূড়ান্ত হিসাব এখনও প্রস্তুত হয়নি। মাঠপর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, কোরবানি অনেকটাই মানুষের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে। এবার কোরবানির সংখ্যা কিছুটা বেশি বা কম হয়েছে কি না, তা চূড়ান্ত তথ্য পাওয়ার পরই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে।

অবিক্রীত পশুর বিষয়ে তিনি বলেন, “কোরবানির সময় সব পশু বিক্রি হয়ে যাবে এবং পরে বাজারে সংকট দেখা দেবে—এটা কাম্য নয়। কিছু পশু উদ্বৃত্ত থাকলে সারা বছর বাজারে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।