কর প্রশাসনে অনিয়ম, ইউডি জালিয়াতি, পদায়নে প্রভাব ও সম্পদের উৎস নিয়ে নানা অভিযোগ; স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জোরালো। ফাইল ছবি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর ও শুল্ক প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য এবং কর ফাঁকিতে সহায়তার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে করদাতাদের কর ফাঁকির সুযোগ করে দিচ্ছেন। আবার ঘুষ না দিলে মিথ্যা মামলা কিংবা প্রশাসনিক হয়রানির ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
করদাতাদের অভিযোগ, অতিরিক্ত বা অগ্রিম পরিশোধ করা কর ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা অনিয়ম ঘটে। আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত পরিশোধিত অর্থ ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, বাস্তবে সেই অর্থ ফেরত পেতে অনেককে ঘুষ বা অনৈতিক সুবিধা দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং একাধিক সূত্র থেকে অনুসন্ধানী গণমাধ্যম দ্য ফিন্যান্স টুডে-এর কাছে পাঠানো বিভিন্ন তথ্য ও অভিযোগ যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে আলোচনায় আসে সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত এনবিআরের যুগ্ম কমিশনার কাজিয়া সুলতানার নাম।
বিসিএস (শুল্ক ও আবগারি) ক্যাডারের কর্মকর্তা কাজিয়া সুলতানা সম্প্রতি যুগ্ম কমিশনার (গ্রেড-৫) পদে পদোন্নতি পেয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। তবে তার পদোন্নতির পাশাপাশি তার ও তার স্বামীর বিপুল সম্পদের উৎস, অতীত কর্মকাণ্ড এবং দায়িত্ব পালনকালে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইউডি জালিয়াতির অভিযোগ কেন্দ্রবিন্দুতে
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ঢাকা উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে কাজিয়া সুলতানার বিরুদ্ধে ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (UD) ও বন্ড সুবিধা সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, জংশিন টেক্সটাইল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় নথি যথাযথভাবে যাচাই না করেই পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার আমদানির প্রাপ্যতা অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, বন্ড সুবিধার আওতায় না থাকা একটি পণ্যের জন্যও অনুমোদন দেওয়া হয়। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার এজাহারেও বিভিন্ন অনিয়মের উল্লেখ রয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
এছাড়া ২০২৪ সালের আগস্টে একই প্রতিষ্ঠানের জন্য দেওয়া আরেকটি প্রাপ্যতা অনুমোদনেও কাজিয়া সুলতানার স্বাক্ষর রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নিরীক্ষার সময় প্রয়োজনীয় আমদানি-রপ্তানির তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি।
নথি যাচাই ছাড়াই অনুমোদনের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব পালনকালে একাধিক প্রতিষ্ঠানের আমদানি-রপ্তানির নথি এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদন যথাযথভাবে যাচাই না করেই অনুমোদন দেওয়া হতো। অভিযোগকারীদের দাবি, এর মাধ্যমে কিছু প্রতিষ্ঠান অবৈধ সুবিধা পেয়েছে এবং সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
পদায়নে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে কাজিয়া সুলতানা রাজস্ব-সংবেদনশীল গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রভাবশালী মহলের সমর্থনের কারণেই তিনি দীর্ঘদিন এসব পদে বহাল ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর কার্যকর তদন্ত হয়নি।
বিপুল সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্নের ঝড়
অনুসন্ধানে কাজিয়া সুলতানা ও তার স্বামী, শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা মহিউদ্দীন আহমেদ-এর নামে ও সংশ্লিষ্টতায় বিপুল সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী তাদের সম্পদের মধ্যে রয়েছে—
. আফতাবনগরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা মূল্যের প্লট এবং সেখানে প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আটতলা ভবন।
. বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট।
. প্রায় ১২ কাঠার একটি মূল্যবান প্লট।
. উত্তর বাড্ডার বিটিআই শপিংমলে দুটি বাণিজ্যিক দোকান।
. উত্তরা সেক্টর-১১ এলাকায় জমি।
. একাধিক ব্যক্তিগত গাড়ি।
. গ্রামের বাড়িতে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি ডুপ্লেক্স ভবন।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সম্পদের প্রকৃত বাজারমূল্য সরকারি নথিতে প্রদর্শিত মূল্যের তুলনায় অনেক বেশি এবং সম্পদের উৎস নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।
অতীতেও বিভাগীয় ব্যবস্থার অভিযোগ
সূত্রের দাবি, আইসিডি কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়মের অভিযোগে কাজিয়া সুলতানার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এর ফলে নির্ধারিত সময়ে তিনি পদোন্নতি পাননি বলেও জানা গেছে।
পরবর্তীতে তিনি ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট এবং পরে ঢাকা পশ্চিম ভ্যাট কমিশনারেটে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময়েও বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনিয়ম ও আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ ওঠে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনের ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি।
অভিযোগের মধ্যেই পদোন্নতি
গত ২২ জুন জারি হওয়া প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কাজিয়া সুলতানাকে বিসিএস (শুল্ক ও আবগারি) ক্যাডারের যুগ্ম কমিশনার (গ্রেড-৫) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—এতসব অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি পদোন্নতি পেলেন?
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কাজিয়া সুলতানা ও তার স্বামী মহিউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর বন্ধ বা অপ্রাপ্য থাকায় কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
স্বচ্ছ তদন্তের দাবি
সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, রাজস্ব প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অভিযোগ জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন।
তাদের মতে, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি রাজস্ব প্রশাসনে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
উল্লেখ্য যে, এই প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য বিভিন্ন অভিযোগ, নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়ার চেষ্টা করা হলেও তা পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে তাদের কোনো বক্তব্য বা ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে হুবহু প্রকাশ করা হবে।
