দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণার মধ্যেও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর প্রধান কার্যালয়ে চলছে চরম অনিয়ম ও গোপন তথ্য পাচারের অভিযোগ। বিআরটিএ ঢাকা মেট্রো সার্কেল-১ (মিরপুর)-এর বিতর্কিত সহকারী পরিচালক (এডি) শেখ ইমরানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ার পর সেই গোপন নথি অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তার হাতে পৌঁছে যাওয়ার ঘটনায় সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ উঠেছে, চেয়ারম্যান দপ্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে কীভাবে সংবেদনশীল অভিযোগপত্র অভিযুক্ত কর্মকর্তার হাতে পৌঁছে গেল—এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিষয়টি শুধু তথ্য ফাঁস নয়, বরং একটি সংঘবদ্ধ তথ্য পাচার চক্রের ইঙ্গিত বহন করে।
অভিযোগপত্র জমা হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়ার পরই এডি শেখ ইমরান বেপরোয়া আচরণ শুরু করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও সম্ভাব্য তদন্তকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে তিনি অনুসন্ধানী সাংবাদিক মাহমুদুল হাসান ও রাহিমা আক্তার মুক্তাকে সরাসরি হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, অফিসিয়াল ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে তিনি প্রকাশ্যে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে অডিট কিংবা চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ দিয়ে কোনো কাজ হবে না, কেউ আমার কিছুই করতে পারবে না।” চাকরির মেয়াদ শেষে অবসরের দ্বারপ্রান্তে থাকা একজন কর্মকর্তার এমন বক্তব্যে সেবাগ্রহীতা ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠে এসেছে, বিআরটিএ প্রধান কার্যালয় থেকে এই স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁসের ঘটনায় চেয়ারম্যান দপ্তরের পিএ-২ রেজাউলের নাম সামনে এসেছে।
জানা গেছে, গত ২ আগস্ট ২০২৬ ভুক্তভোগী নাগরিক আবদুল্লাহ আল মামুন বিআরটিএ চেয়ারম্যান এবং অডিট ও প্রশাসন শাখা বরাবর দুটি পৃথক লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগপত্র দুটি চেয়ারম্যান দপ্তরে গ্রহণ করেন পিএ-২ রেজাউল। অভিযোগকারীর দাবি, আবেদন জমা দেওয়ার পরপরই এর বিস্তারিত তথ্য অভিযুক্ত এডি শেখ ইমরানের কাছে পৌঁছে যায়।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, পিএ-২ রেজাউল দীর্ঘদিন ধরে দপ্তরে অবস্থান করে গোপন লেনদেন কিংবা ব্যক্তিগত সখ্যতার ভিত্তিতে বিভিন্ন অসাধু কর্মকর্তার কাছে অভিযোগপত্র ও সংবেদনশীল তথ্য পাচার করে আসছেন। এ বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ সাংবাদিকদের কাছে রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
আবদুল্লাহ আল মামুন তার লিখিত আবেদনে বিআরটিএ মিরপুর সার্কেলে এডি শেখ ইমরানের কক্ষে বহিরাগত সিন্ডিকেটের নিয়মিত যাতায়াতের অভিযোগ তুলে বিচারিক স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ অবিলম্বে জব্দ ও সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, এডি শেখ ইমরানের অনিয়মের অন্যতম সহযোগী হিসেবে বিআইসি মিস্ত্রি মিরাজ কাজ করছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ফিটনেস শাখা থেকে সংগৃহীত অবৈধ অর্থের হিসাব, বণ্টন ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এছাড়া জুনিয়র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ভুয়া দাপ্তরিক খরচের ভাউচার দেখিয়ে ব্যক্তিগত বিকাশ ব্যয়, নাস্তা ও ক্যাফেটেরিয়ার বিল পর্যন্ত পরিশোধ করানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
দাপ্তরিক তথ্য পাচার এবং দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের হুমকির ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন সংবাদকর্মীরা। তাদের ভাষ্য, চেয়ারম্যানের পিএ-২ রেজাউলসহ যাদের বিরুদ্ধে তথ্য পাচারের অভিযোগ উঠেছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণাদিসহ খুব শিগগিরই বিআরটিএ চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।
এদিকে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের দাবি, অবসরে যাওয়ার সুযোগে এডি শেখ ইমরান কিংবা তার সহযোগীরা যেন কোনোভাবেই দায়মুক্তি না পান। এজন্য দ্রুত সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ জব্দ, তথ্য ফাঁসের উৎস শনাক্ত এবং অডিট ও প্রশাসন শাখার মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
