পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অর্জনের অভিযোগে নতুন করে দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা ছয়টি মামলার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, গত রোববার সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে একটি মামলার সূত্র ধরে স্থানীয় পুলিশের হাতে আটক হন সাবেক এই আইজিপি। তাঁর বিরুদ্ধে দেশে ও বিদেশে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।
৭৪ কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পাঁচ মামলা
দুদক জানায়, ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেনজীর আহমেদ, তাঁর স্ত্রী জীসান মির্জা এবং দুই মেয়ে ফারহিন রিশতা বেনজীর ও তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে প্রায় ৭৪ কোটি ১৩ লাখ টাকার সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে পাঁচটি মামলা দায়ের করা হয়।
এ ছাড়া ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে পৃথক আরেকটি মামলা করা হয়। পরবর্তীতে অভিযোগপত্রে সম্পদের পরিমাণ বেড়ে ১১ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। এই মামলায় তাঁকে বিদেশ থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার আবেদনও আদালতে করেছে দুদক।
পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগ
অপরাধমূলক অসদাচরণ, প্রতারণা ও তথ্য গোপনের মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবী হয়েও বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে পাসপোর্ট নেওয়ার অভিযোগেও মামলা রয়েছে সাবেক আইজিপির বিরুদ্ধে।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার ও র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি পাসপোর্ট আবেদনে পেশা হিসেবে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ উল্লেখ করেন। বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) ছাড়াই বিভিন্ন সময়ে এমআরপি ও ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদের সাম্রাজ্য!
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদ চাকরিজীবনেই সরকারি মূল্যে বিপুল পরিমাণ জমি ও সম্পদ অর্জন করেন। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে জবরদস্তিমূলকভাবে অনেক জমির মালিক হয়েছেন তিনি।
ছয় মামলায় তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ৮৫ কোটি ১৩ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থাকলেও, এসব সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গোপালগঞ্জে ৬০০ একরের বিলাসবহুল রিসোর্ট
গোপালগঞ্জ সদরের টুঠামান্দ্রা মৌজায় প্রায় ৬০০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল এক রিসোর্ট, যার বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক এক হাজার কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
রিসোর্টটিতে রয়েছে—
২০ একরজুড়ে বিশাল পুকুর, মোট ২৮টি পুকুর, চারটি ডুপ্লেক্সসহ ১২টি কটেজ, সুইমিংপুল, শিশু পার্ক, দেশি-বিদেশি ফলের বাগান।
২০১৬ সাল থেকে ধাপে ধাপে নির্মিত এই রিসোর্ট আদালতের আদেশে ক্রোক করা হয়েছে। বর্তমানে গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রিসিভার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জে তাঁর দুটি আলিশান বাংলোর তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।
গুলশানে চারটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের র্যাংকন আইকন টাওয়ারে বেনজীর আহমেদের চারটি ফ্ল্যাট বর্তমানে দুদকের জিম্মায় রয়েছে।
প্রায় ৯ হাজার ১৯০ বর্গফুটের ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটগুলোতে রয়েছে পাঁচটি বেডরুম, নিজস্ব অফিস কক্ষ, ডাইনিং ও কিচেন সুবিধা এবং অত্যাধুনিক ইন্টেরিয়র ডিজাইন।
তদন্ত সূত্রের দাবি, প্রতিটি ফ্ল্যাটের বর্তমান বাজারমূল্য চার থেকে পাঁচ কোটি টাকা হলেও প্রভাব খাটিয়ে তিনি এগুলো অর্ধকোটির কিছু বেশি মূল্যে ক্রয় করেছিলেন।
দামি আসবাব, কাঠের ওয়াল কেবিনেট এবং বিলাসবহুল সাজসজ্জায় সজ্জিত এসব ফ্ল্যাট এখন দুদকের তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, দুবাইয়ে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের আটক হওয়ার ঘটনায় দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ, বিদেশে অর্থ পাচার, পাসপোর্ট জালিয়াতি এবং দুর্নীতির একাধিক মামলা—সব মিলিয়ে দেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত দুর্নীতি অনুসন্ধানে পরিণত হয়েছে বেনজীর অধ্যায়।
