ফাইল ছবি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন সমঝোতা চুক্তির খবর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে স্বস্তির আবহ তৈরি করলেও, এর কার্যকারিতা নিয়ে রয়ে গেছে গভীর সংশয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি অস্থির মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের জটিল সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়; বরং নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কাকে সাময়িকভাবে ঠেকিয়ে রাখার একটি উদ্যোগ মাত্র।
১৫ সপ্তাহব্যাপী সংঘাতের সময় ইরানের ড্রোন হামলার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু ছিল কুয়েত। দেশটির ৩৭ বছর বয়সী প্রকৌশলী ইয়াদ জুম্মা বলেন, চুক্তিটি হয়তো কিছু সময়ের জন্য পরিস্থিতি শান্ত করবে। কিন্তু এর প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো উত্তেজনার মূল কারণগুলো কতটা সমাধান করতে পারে, তার ওপর।
চুক্তি ঘোষণার পর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান কয়েকজন বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে। তাদের প্রায় সবাই মনে করেন, আগামী শুক্রবার স্বাক্ষরিত হতে যাওয়া এই সমঝোতা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারবে না।
লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ নিল কুইলিয়াম বলেন, এটি মূলত বড় একটি ব্যান্ডেজের মতো। ক্ষত ঢেকে রাখা হয়েছে, কিন্তু ভেতরের সমস্যাগুলো রয়ে গেছে। ফলে যে কোনো সময় আবারও সংঘাত ফিরে আসতে পারে।
৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, কিন্তু জটিল সমস্যার সমাধান কি সম্ভব?
সমঝোতা স্মারকে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত, পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং জব্দকৃত ইরানি সম্পদ মুক্ত করার মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা হবে।
তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, মাত্র দুই মাসের মধ্যে এসব জটিল বিষয়ে চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব।
তারা স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি সম্পন্ন করতে প্রায় ১৮ মাস সময় লেগেছিল। ওই চুক্তিতে পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা আরোপের বিনিময়ে অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছিল ইরান। কিন্তু পরবর্তীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন।
লেবাননে যুদ্ধবিরতি, তবু শান্তির নিশ্চয়তা নেই
নতুন চুক্তির অংশ হিসেবে লেবাননে আবারও যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। যদিও এতে অসন্তুষ্ট ইসরায়েল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
গাজার উদাহরণ টেনে তারা বলেন, গত বছর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলেও এরপর প্রায় এক হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার ৬০ শতাংশের বেশি এলাকা এখনো ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে এবং হামাসও অস্ত্র সমর্পণ করেনি। ফলে চুক্তির দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপ বাস্তবায়নেও কার্যত অগ্রগতি হয়নি।
‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ প্রশ্নে ইসরায়েলের হতাশা
চুক্তি নিয়ে সবচেয়ে বেশি হতাশ ইসরায়েল। কারণ, এতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কিংবা তথাকথিত ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা ‘প্রতিরোধের অক্ষ’-কে দেওয়া সহায়তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
এই জোটে রয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাস, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী এবং ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী।
জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের সামরিক ইতিহাসবিদ ড্যানি অরবাখ বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে চেয়েছে ইসরায়েল। তাদের লক্ষ্য, অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স যেন আর কখনো দেশটির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে না পারে। কিন্তু ৭ অক্টোবরের স্মৃতি মুছে যেতে বহু বছর লাগবে। ফলে ইসরায়েলের অবস্থানও দ্রুত বদলাবে না।
সবচেয়ে বড় ধাক্কায় উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো
চুক্তির খবরে সবচেয়ে বড় ধাক্কা অনুভব করছে উপসাগরীয় সুন্নি আরব দেশগুলো। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ভিত্তি সাম্প্রতিক সংঘাতে নড়বড়ে হয়ে গেছে।
ইরানের হামলায় কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের বেসামরিক অবকাঠামোর যে ক্ষতি হয়েছে, তা মেরামত করতে মাস নয়, অনেক ক্ষেত্রে বছরও লেগে যেতে পারে।
লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের এইচ.এ. হেলিয়ার বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন আরও আত্মবিশ্বাসী এবং আরও আক্রমণাত্মক ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার নতুন কৌশল খুঁজবে। তারা আর আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে পারবে না, এ বিষয়ে প্রায় সবাই একমত। তবে ভবিষ্যৎ কৌশল কী হবে, তা নিয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
তার মতে, ইরান যেভাবে অঞ্চলজুড়ে প্রভাব বিস্তার করছে, তা নিয়ে আরব বিশ্বের উদ্বেগ বাড়ছে। অথচ নতুন সমঝোতা চুক্তিতে সেই মৌলিক প্রশ্নগুলোর কোনো কার্যকর সমাধান নেই।
সারসংক্ষেপ
বিশ্লেষকদের অভিমত একটাই—যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা আপাতত যুদ্ধের আগুন কিছুটা নিভিয়ে দিতে পারে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের গভীরে জমে থাকা অবিশ্বাস, প্রক্সি যুদ্ধ, পারমাণবিক উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বের স্থায়ী সমাধান এই চুক্তিতে নেই। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির পথ এখনও দীর্ঘ, অনিশ্চিত এবং কাঁটায় ভরা।
