কমিটি গঠন নিয়ে প্রশ্ন, হাইকোর্টের ছয় মাসের স্থগিতাদেশে থমকে মৌখিক পরীক্ষা; কৃষক কার্ড বাস্তবায়নেও জনবল সংকটের আশঙ্কা। ফাইল ছবি
নিয়োগের দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে গঠন করা হয়েছিল সরকারের উচ্চপর্যায়ের কমিটি। লক্ষ্য ছিল দ্রুত নিয়োগ সম্পন্ন করা। কিন্তু সেই উদ্যোগের মধ্যেই আইনি জটিলতায় থমকে গেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নিয়োগ কার্যক্রম। দুই হাজার ৩৬০টি পদের বিপরীতে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৪৩০ প্রার্থী এখন অনিশ্চয়তার মুখে। কবে হবে মৌখিক পরীক্ষা, কবে মিলবে কাঙ্ক্ষিত চাকরি—কোনো প্রশ্নেরই নিশ্চিত উত্তর নেই সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) কাছে।
একদিকে হাইকোর্টের ছয় মাসের স্থগিতাদেশ, অন্যদিকে নিয়োগ কার্যক্রমের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন নিয়ে বিতর্ক—সব মিলিয়ে জটিল হয়ে উঠেছে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া। দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকা প্রার্থীদের মধ্যে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়ার শঙ্কাও বাড়ছে। পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে স্মারকলিপি দিয়েছেন তাঁরা। কৃষিমন্ত্রী, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী, পিএসসির চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছেও আবেদন জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
শুধু চাকরিপ্রার্থীদের ভবিষ্যৎ নয়, এই নিয়োগের দীর্ঘসূত্রতা প্রভাব ফেলতে পারে মাঠপর্যায়ের কৃষিসেবাতেও। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার ঘাটতিতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সেবা প্রদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সরকারের কৃষক কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নেও বাড়তে পারে প্রতিবন্ধকতা।
আড়াই বছরের অপেক্ষা, তবু নিয়োগের শেষ ধাপে অনিশ্চয়তা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার দুই হাজার ৩৬০টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ। এরপর ২০২৫ সালের ৭ জুলাই অনুষ্ঠিত হয় বহুনির্বাচনী (এমসিকিউ) পরীক্ষা। উত্তীর্ণ প্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয় একই বছরের ৬ অক্টোবর। দীর্ঘ অপেক্ষার পর গত ৮ সেপ্টেম্বর লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে পিএসসি। কিন্তু ফল প্রকাশের পর মৌখিক পরীক্ষার পর্যায়ে এসে থেমে যায় নিয়োগের চাকা।
গত ২১ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ নিয়োগ কার্যক্রম ছয় মাসের জন্য স্থগিত রাখার আদেশ দেন। একই সঙ্গে এ-সংক্রান্ত রুল জারি করেন আদালত। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৪ অক্টোবর পিএসসি জানায়, ৭ ও ৮ অক্টোবর নির্ধারিত মৌখিক পরীক্ষা অনিবার্য কারণে স্থগিত করা হয়েছে। নতুন তারিখ পরে ঘোষণা করা হবে বলেও জানানো হয়।
কিন্তু এরপর ১৮ দিন পেরিয়ে গেলেও মৌখিক পরীক্ষার নতুন সূচি প্রকাশ করা হয়নি। পিএসসির বক্তব্য, আদালতের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে নিয়োগের শেষ ধাপে পৌঁছেও অনিশ্চয়তার বৃত্তে আটকে রয়েছেন উত্তীর্ণ প্রার্থীরা।
ফল প্রকাশের ঠিক আগে কমিটি, প্রশ্নের মুখে উদ্যোগের উদ্দেশ্য
নিয়োগ কার্যক্রমের মধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাইকোর্টে রিট করেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। তাঁদের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের দাবি, কমিটি গঠনের সময় এবং লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের মধ্যবর্তী ব্যবধান সন্দেহের অবকাশ তৈরি করেছে।
তিনি গণমাধ্যম কে বলেন, লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের মাত্র দুই দিন আগে কমিটি গঠন করা হয়। গত ৬ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে কমিটি গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। আর ৮ সেপ্টেম্বর লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে পিএসসি।
শিশির মনিরের ভাষ্য, একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কার্যক্রম চলমান থাকা অবস্থায় এ ধরনের কমিটি গঠনের সুযোগ নেই। আদালতে তাঁদের বক্তব্য ছিল, কমিটি গঠনের মাধ্যমে ফল প্রকাশের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে পদ ছিল দুই হাজার ৩৬০টি। অথচ লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সাত হাজার ২২৯ জনের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র ৪৩০ জন। কমিটি গঠন ও লিখিত পরীক্ষার ফল—দুটি বিষয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
তবে কমিটি গঠন কিংবা পরীক্ষার ফল নিয়ে ওঠা এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়।
চার সদস্যের কমিটি, কিন্তু কার্যপরিধি নিয়ে অস্পষ্টতা
গত ৬ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার শূন্য পদে নিয়োগ দ্রুত সম্পন্ন করতে চার সদস্যের কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়। কমিটির আহ্বায়ক করা হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীকে। অন্য সদস্যরা হলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, শূন্য পদে নিয়োগ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কমিটি। কিন্তু কীভাবে নিয়োগ দ্রুত সম্পন্ন করা হবে, সে বিষয়ে কার্যপরিধিতে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই বলে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। এমনকি নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ কৃষি মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রতিনিধিকেও কমিটিতে রাখা হয়নি।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা পদটি পিএসসির বৃহত্তর নন-ক্যাডার নিয়োগ কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। কৃষি মন্ত্রণালয়ের চাহিদার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করছে পিএসসি। ফলে চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট পদের জন্য পৃথক উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।
একাধিক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, পিএসসির সক্ষমতা কিংবা দীর্ঘসূত্রতা যদি সমস্যার কারণ হয়ে থাকে, তাহলে কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় করে তা সমাধান করাই স্বাভাবিক পদ্ধতি। চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যে পৃথক প্রশাসনিক কমিটি গঠন ভবিষ্যতের জন্য ভালো নজির তৈরি করবে না।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, কমিটি গঠনের পর একটি বৈঠক হয়েছে। আরও একটি বৈঠক হলে কমিটি সুপারিশ দেবে। মৌখিক পরীক্ষা স্থগিতের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি পিএসসির বিষয়।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, পিএসসির সুপারিশ ছাড়া নিয়োগ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে আপাতত দুটি পথ খোলা রয়েছে। একটি হলো, বিধিমালা সংশোধন করে পদগুলোকে পিএসসির আওতার বাইরে নেওয়া। অন্যটি অ্যাডহক নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। তবে উভয় পদ্ধতিতেই নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে এবং অনিয়ম-দুর্নীতির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
৪৩০ প্রার্থীর সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, বাড়ছে বয়স হারানোর ভয়
লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ একাধিক প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগের অপেক্ষায় থেকে তাঁরা এখন চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর আড়াই বছরের বেশি সময় পার হয়েছে। দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেকের চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রার্থীদের উদ্বেগ, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও যদি মৌখিক পরীক্ষা ও নিয়োগ কার্যক্রম দীর্ঘদিন আটকে থাকে, তাহলে তাঁদের অনেকের চাকরিতে প্রবেশের সুযোগই হাতছাড়া হতে পারে। দীর্ঘ প্রস্তুতি, পরীক্ষা ও অপেক্ষার পর এমন অনিশ্চয়তা তাঁদের হতাশ করে তুলেছে।
তাঁদের দাবি, আদালতের আদেশের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আইনি জটিলতা নিরসনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হোক। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছতা ও বিধিবিধান অনুসরণ করে দ্রুত সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা হোক, যাতে যোগ্য প্রার্থীরা দীর্ঘসূত্রতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হন।
কৃষক কার্ড বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ জনবল সংকট
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার মোট পদ রয়েছে ১৪ হাজার ১০০টি। এর মধ্যে তিন হাজার ৭৫১টি শূন্য পদে নিয়োগের জন্য পিএসসিতে চাহিদাপত্র পাঠিয়েছে মন্ত্রণালয়।
সরকারের কৃষক কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ, তাঁদের কৃষক কার্ডের আওতায় আনা এবং কর্মসূচির কার্যক্রম তদারকিতে এসব কর্মকর্তার সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
এ ছাড়া কৃষকদের আধুনিক কৃষিপদ্ধতি সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া, ফসলের রোগবালাই ও অন্যান্য সমস্যা চিহ্নিত করা এবং কৃষি সম্প্রসারণ সেবা পৌঁছে দেওয়ার কাজও তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পদ পূরণ না হওয়ায় মাঠপর্যায়ে জনবল সংকট তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা না গেলে কৃষকদের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং কৃষক কার্ড কর্মসূচির বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনায় বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে নিয়োগের দীর্ঘসূত্রতা কেবল চাকরিপ্রার্থীদের অনিশ্চয়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষিসেবার মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমেও।
আদালতের আদেশ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা
পিএসসির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (নন-ক্যাডার) মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, একটি মামলার কারণে নিয়োগ কার্যক্রম ছয় মাসের জন্য স্থগিত হয়েছে। এ কারণে অনিবার্য পরিস্থিতিতে মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। কোন মামলার পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি কমিশনের ইউনিট-৮ শাখা ভালো বলতে পারবে।
ইউনিট-৮ শাখার পরিচালক কাজী তোফায়েল আহাম্মদ বলেন, আদালত ছয় মাসের জন্য স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। আদালত সেই আদেশ প্রত্যাহার করলে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
ফলে নিয়োগ দ্রুত করতে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে দুই হাজার ৩৬০টি পদের নিয়োগ এখন আদালতের আদেশের ওপর নির্ভরশীল। একদিকে ৪৩০ উত্তীর্ণ প্রার্থীর চাকরির স্বপ্ন ও বয়সসীমা হারানোর শঙ্কা, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে কৃষিসেবার জন্য প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি—সব মিলিয়ে দ্রুত সমাধানের দাবি জোরালো হচ্ছে।
এখন মূল প্রশ্ন, আইনি জটিলতা নিরসন করে কবে আবার শুরু হবে মৌখিক পরীক্ষা? কবে শেষ হবে দীর্ঘদিনের অপেক্ষা? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগের মধ্য দিয়েই।
