ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে দরবারপ্রধান আব্দুর রহমান শামীমকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ছয় দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো আইনের জালে ধরা পড়েনি কোনো আসামি। অথচ মামলার এজাহারভুক্ত অভিযুক্তদের অনেকেই দিব্যি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন—এই বাস্তবতা যেন ন্যায়বিচারের প্রতি এক নিঃশব্দ ব্যঙ্গ। এতে করে ক্ষোভ আর হতাশার অদৃশ্য আগুনে জ্বলছে পুরো এলাকা।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, চারজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় প্রায় ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি খাজা আহম্মেদ, হোসেনাবাদ বিশ্বাসপাড়া গ্রামের উপজেলা খেলাফত মজলিসের সভাপতি মো. আসাদুজ্জামান, পশ্চিম ফিলিপনগর গ্রামের জামায়াতকর্মী রাজিব মিস্ত্রি এবং স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষক মো. শিহাব।
কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়—এজাহারভুক্ত এই আসামিদের অনেকেই যেন কোনো ভয়ের তোয়াক্কা না করেই এলাকায় স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছেন। কেউ সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়, কেউ আবার জনসমক্ষে দেখা দিচ্ছেন নিয়মিত। ‘হুকুমদাতা’ হিসেবে অভিযুক্ত খাজা আহম্মেদ তো গত মঙ্গলবার রাতে নিজের ফেসবুক আইডি থেকেই ১২ মিনিটের একটি ভিডিও প্রকাশ করে হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় আসামি খেলাফত মজলিস নেতা আসাদুজ্জামান আসাদকে স্থানীয় হোসেনাবাদ এলাকার একটি মসজিদে ইমামতি করতে দেখা গেছে। এমনকি বৃহস্পতিবার দুপুরেও তাকে হোসেনাবাদ বাজারে মোটরসাইকেল চালিয়ে ঘুরতে দেখেছেন স্থানীয়রা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, আমরা জানি তার নামে মামলা হয়েছে, কিন্তু তাকে দেখে মনে হলো যেন কিছুই ঘটেনি!
এমন দৃশ্য যেন আইনের শাসনের ওপর এক নির্মম প্রশ্নচিহ্ন। যেখানে অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তরা অবাধে ঘুরে বেড়ান, সেখানে সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তা আর বিচার নিয়ে শঙ্কা জন্মানোই স্বাভাবিক।
দৌলতপুর থানার ওসি আরিফুর রহমান জানিয়েছেন, এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি, তবে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তার এই বক্তব্য যেন অপেক্ষার প্রহরকে আরও দীর্ঘ করে তুলছে।
অন্যদিকে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে সব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। উপজেলা জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দাবি করেছে, তাদের নেতাকর্মীরা এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।
উল্লেখ্য, একটি পুরোনো ভিডিওকে কেন্দ্র করে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লে গত শনিবার ফিলিপনগর এলাকায় শামীমের দরবারে হামলা চালানো হয়। উত্তেজিত জনতা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালিয়ে এক পর্যায়ে তাকে পিটিয়ে হত্যা করে।
এই ঘটনার পর থেকে কুষ্টিয়ার আকাশে যেন নীরব এক প্রশ্ন ভাসছে—
ন্যায়বিচার কি কেবলই অপেক্ষার নাম, নাকি তা একদিন সত্যিই ফিরে আসবে মানুষের আস্থার আলো হয়ে?
