সোমবার, ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বনের রক্ষক যখন ভক্ষক, বান্দরবানে রেঞ্জ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও বন নিধনের গুরুতর অভিযোগ

বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি
সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ ১০:৫৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ফাইল ছবি

পাহাড়, বন আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জেলা বান্দরবান। অথচ সেই বন রক্ষার দায়িত্ব যাদের হাতে, তাদেরই একজনের বিরুদ্ধে উঠেছে গুরুতর দুর্নীতি, অনিয়ম ও বন নিধনের অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, বান্দরবান সদর রেঞ্জ কর্মকর্তার নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে বন থেকে গাছ কাটা, ভুয়া টিপি (চলাচল পাস), কাঠ পাচার এবং পোস্টিং বাণিজ্যসহ নানা অনিয়ম চলছে। এতে একদিকে বন উজাড় হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে বন বিভাগের অভ্যন্তরীণ নজরদারি নিয়েও।

অভিযোগ অনুযায়ী, বান্দরবান সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলামের তদারকিতে এসব অনিয়ম চলছে। দীর্ঘদিন ধরে বন নিধনের অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। তবে অভিযোগের বিষয়ে বন বিভাগ বলছে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং তদন্ত শুরু হয়েছে।

পোস্টিং বাণিজ্যের অভিযোগ

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাবেক বন সংরক্ষক (সিএফ) মোল্যা রেজাউল করিমকে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দিয়ে বান্দরবান সদর রেঞ্জ কর্মকর্তার চেয়ার বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, ওই বন সংরক্ষকের প্রশ্রয় পেয়ে বান্দরবান বন বিভাগে প্রভাব বিস্তার করেন তিনি।

অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের বরাতে জানা যায়, বান্দরবানে বিভিন্ন লোভনীয় পোস্টিংয়ের জন্য কথিতভাবে নির্ধারিত রয়েছে ঘুষের রেট। রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিভিন্ন স্টেশনে পোস্টিং পেতে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা, রেঞ্জ সহযোগী পদে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা এবং সদর রেঞ্জ ও স্টেশনে ফরেস্ট গার্ডদের পোস্টিংয়ের জন্য ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

টিপি ঘিরে লাখ লাখ টাকার কারবার?

অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশ উঠে এসেছে কাঠ পরিবহনের টিপি বা চলাচল পাসকে ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতি টিপিতে ১৩ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। কথিত ভাগবাটোয়ারায় এর মধ্যে ডিএফওর জন্য ২ হাজার ৩০০ টাকা, সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) ৬০০ টাকা, রেঞ্জ কর্মকর্তা ৮০০ টাকা, অফিস সেকশন ৬০০ টাকা, ফরেস্টার ২ হাজার ৬০০ টাকা এবং ফরেস্ট গার্ড ২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার বান্দরবান সদর রেঞ্জের টিপি শাখায় এসব টাকার কথিত ভাগবাটোয়ারা হয়।

স্টক চেকিং ও জোত পারমিটেও নির্ধারিত ‘রেট’

অভিযোগ রয়েছে, স্টক চেকিংয়ের ক্ষেত্রেও ঘনফুটপ্রতি মোট ৯ টাকা করে নেওয়া হয়। কথিত ভাগ অনুযায়ী, এর মধ্যে রেঞ্জ কর্মকর্তা ২ টাকা, ডিএফও ৬ টাকা এবং অফিস ১ টাকা পেয়ে থাকে।

অন্যদিকে জোত পারমিটের ক্ষেত্রে ঘনফুটপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ডিএফও ১৭ টাকা, রেঞ্জ কর্মকর্তা ২০ টাকা, স্টাফ ও ফরেস্টার ৫ টাকা এবং অফিস ও অন্যান্য খাতে ১৩ টাকা করে ভাগ হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

পারমিট পাওয়ার পর ট্রাকে কাঠ লোড করার ক্ষেত্রেও বন বিভাগকে ট্রাকপ্রতি ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

বৈধ টিপির আড়ালে অবৈধ কাঠ পাচারের অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, বৈধ টিপির আড়ালে অবৈধভাবে বনের কাঠ পাচারের ক্ষেত্রেও রয়েছে আলাদা ‘রেট’। সুয়ালক চেক স্টেশনে একটি ট্রাক পার করতে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয় বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

বান্দরবানে দেড় শতাধিক কাঠ ব্যবসায়ী রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় কোন ব্যবসায়ীর কাঠ বৈধ টিপির আড়ালে পাচার করা হবে। পরে ট্রাক লোডের আগেই সেই লটারির তালিকা পৌঁছে দেওয়া হয় বান্দরবান বন বিভাগে।

এমন অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু বন বিভাগের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম নয়, বরং পাহাড়ি বনাঞ্চল রক্ষার সরকারি ব্যবস্থাপনা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করে।

অভিযোগ অস্বীকার রেঞ্জ কর্মকর্তার

তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বান্দরবান সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমি নতুন এসেছি। এসব অভিযোগ সঠিক নয়।

তদন্ত শুরু, সত্যতা মিললে কঠোর ব্যবস্থা: ডিএফও

সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে বান্দরবান বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. তৌফিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি বন বিভাগ খতিয়ে দেখছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, সদর রেঞ্জ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে টাকা নেওয়ার মতো সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ আমাদের নজরে এসেছে। এখনো পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ সরাসরি আসেনি। তবে দুই-একটি পত্রিকায় এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি এবং ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে।

ব্যক্তিগত অভিযোগের পাশাপাশি পুরো বন বিভাগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়েও কথা বলেন ডিএফও মো. তৌফিকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, আমি সব জায়গায় সতর্কবার্তা দিয়েছি, যেন কোনো ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে কেউ জড়িয়ে না পড়ে। দুর্নীতির প্রশ্নে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছি।

এখন প্রশ্ন উঠেছে—তদন্তে এসব অভিযোগের কতটা সত্যতা পাওয়া যায় এবং বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বন বিভাগ শেষ পর্যন্ত কী ব্যবস্থা নেয়। তদন্তের ফলাফলই দিতে পারে এসব অভিযোগের প্রকৃত চিত্র।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।