তিন মেয়াদের পর পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতা হারাতে যাচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। ছবি: এএফপি
বহু বছর আগে অটল বিহারী বাজপেয়ী আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বিজেপি সাফল্য পেলেও পশ্চিমবঙ্গে শক্ত ভিত্তি গড়তে পারছে না। এটা তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টের। দেশটির প্রয়াত এই প্রধানমন্ত্রীর আক্ষেপ এবার ঘুঁচতে যাচ্ছে।
ভারতীয় কয়েকটি গণমাধ্যমে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত যে প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ২০৫টি আসনে এগিয়ে। বিপরীতে তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে ৮৪টিতে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ছিল ১৪৮ আসন, যা দুপুরের দিকেই পার করে গেরুয়া শিবির। এর মাধ্যমে তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতের এই রাজ্যে গত ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় মমতার দল। বিজেপি প্রথমবারের মতো এখানে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, রাজ্যজুড়ে এক নামে পরিচিত (দিদি) মমতার দলের বড় বিপর্যয়ের কারণ কী? বিষয়টি বুঝতে কয়েকটি বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের প্রচারের সময় থেকেই এগুলোকে ফলাফল নির্ধারণের ‘ফ্যাক্টর’ বলা হচ্ছিল। এর মধ্যে আছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল এবং এসআইআর বা ভোটার তালিকা সংশোধন করা আসন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করছে- এমন দুটি গণমাধ্যমের (ডিকোডার ও নিউজ ১৮) ফলাফল তালিকা ঘেঁটে দেখা গেছে, ‘ফ্যাক্টর’ হওয়া আসনগুলোর (১৪৮টি) অধিকাংশে পিছিয়ে আছে মমতার দল। মোট ২৯৪টি (একটি স্থগিত) আসনের মধ্যে ২০২১ সালের নির্বাচনের তুলনায় বিজেপি এবার ১২৮টি বেশি আসনে এগিয়ে। বিপরীতে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) হারিয়েছে ১৩২টি।
মুসলিম, এসআইআর ও মতুয়া ভোট
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ঐতিহ্যগতভাবে প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম ভোটার তৃণমূল কংগ্রেসের বড় শক্তির জায়গা। এবারের নির্বাচনে ২৯৩টি আসনের মধ্যে ৫৪টিকে মুসলিম অধ্যুষিত আসন হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এগুলোতে ২০২১ সালের তুলনায় এবার বিজেপি বড় চমক দেখিয়েছে।
তৃণমূল বিগত নির্বাচনের তুলনায় এসব অঞ্চলে কেবল বিজেপির কাছেই ১১টি আসন হারিয়েছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে টিএমসির প্রাপ্ত আসন ছিল ৫২টি। এবার তারা পেয়েছে ৩৬টি। বিজেপি গত নির্বাচনে পেয়েছিল মাত্র ১টি, এবার পেয়েছে ১২টি।
নির্বাচনের আগে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)। বিবিসির তখনকার একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, তথাকথিত ‘বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের’ নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার উদ্দেশে সংশোধন কার্যক্রম চালানো হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয় তা অনুযায়ী, বিবেচনাধীনসহ বাদ পড়েন প্রায় ১ কোটি ভোটার।
ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাব যেসব আসনে বেশি পড়েছে এমন আসন ৯৪টি। ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, সংশোধনের আগে অর্থ্যাৎ, ২০২১ সালের নির্বাচনে এসব অঞ্চলে টিএমসির প্রাপ্ত আসন ছিল ৭২টি। এবার পেয়েছে মাত্র ৩০টি। বিপরীতে গত নির্বাচনের ২২টির বিপরীতে বিজেপি এবার পেয়েছে ৬৩টি।
এছাড়া, মতুয়া অধ্যুষিত ১১টি আসনের ভোটের ফলাফলে এবার কোনো পরিবর্তন হয়নি। বিজেপি ১০টিই ধরে রেখেছে। পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৭ শতাংশ মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির একটি বড় ভোট ব্যাংক।
টিএমসির ঘাঁটি ও বেলওয়েদার
পশ্চিমবঙ্গে গত তিনটি নির্বাচনেই অন্তত ১০ শতাংশের বেশি ভোটের ব্যবধানে টিএমসি জয়ী হয়েছে এমন আসন ৩৮টি। সেগুলোতে এবার দলটি এগিয়ে আছে মাত্র ১৬টিতে। বিজেপি এগিয়ে আছে ২১টিতে। এছাড়া, ‘বেলওয়েদার’ হিসেবে পরিচিত ১২৪ আসনের মধ্যে টিএমসি ৫৪ ও বিজেপি ৭০টিতে এগিয়ে। ভোটের মাঠে একটি বিশেষ বৈশিষ্ঠ্যের ভিত্তিতে বেলওয়েদার অঞ্চল বা আসন চিহ্নিত করা হয়। সাধারণত বছরের পর বছর যেসব আসনে বেশি ভোট পাওয়া দল সরকার গঠন করে সেগুলোকে বেলওয়েদার বলা হয়।
এর বাইরে সবচেয়ে বড় ব্যবধান গড়ে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ১১৯টি আসন। এগুলোর মধ্যে বিজেপি ১০২টিতে এগিয়ে আছে। বিপরীতে তৃণমূল এগিয়ে মাত্র ১৭ আসনে।
কেজরিওয়াল ‘ইফেক্ট’
এক সময় মমতার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তবে দল বদলানোর পর এবারের নির্বাচনে তিনি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছেন। তিনি নন্দীগ্রামের পাশাপাশি মমতার নিজের আসন ভবানীপুরেও প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেছেন। ভারতীয় গণমাধ্যম ফার্স্টপোস্ট বলছে, এই কৌশলটি মূলত ২০১৫ সালে অরবিন্দ কেজরিওয়াল শুরু করেছিলেন। শীলা দীক্ষিতের দুর্গ হিসেবে পরিচিত নয়াদিল্লি আসনে কেজরিওয়াল নিজে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে জয়ী হয়েছিলেন।
ভবানীপুরে শুভেন্দুকে প্রার্থী করার মাধ্যমে বিজেপি মূলত মমতাকে নিজের আসন রক্ষায় বেশি সময় দিতে বাধ্য করেছে। ফলে অন্য প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা চালানোর জন্য তিনি যথেষ্ট সময় পাননি।
একটি ধর্ষণকাণ্ড ও ভোট
পশ্চিমবঙ্গে টিএমসির নির্বাচনী সাফল্যের নেপথ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নারী ভোটাররা বড় ভূমিকা পালন করে আসছেন। গত ১০ বছরে নারীদের জন্য বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল দলটি। এরমধ্যে কন্যাশ্রী প্রকল্পের মাধ্যমে মেয়েদের পড়াশোনায় আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
তবে এবারের নির্বাচনী মাঠে বিজেপি নারীর নিরাপত্তাকে প্রধান ইস্যু করে তোলে। বিশেষ করে আরজি কর মেডিকেল কলেজে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি তারা সামনে নিয়ে আসে। এমনকি এই ঘটনায় ভুক্তভোগী তরুণীর মাকে একটি আসনে (পানিহাটি) প্রার্থী বানিয়েছে।
নির্বাচনী ইশতেহারে নারীদের জন্য বেশ কিছু বড় প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দলটি। এরমধ্যে আছে, মাসিক ৩ হাজার টাকা করে সহায়তা, বাসে বিনামূল্যে যাতায়াত এবং সরকারি চাকরিতে ৩৩ শতাংশ কোটার ব্যবস্থা। এছাড়া নারীদের নিরাপত্তায় আলাদা পুলিশ স্টেশন এবং ‘দুর্গা সুরক্ষা স্কোয়াড’ গঠনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দলটি।
মাছ ও ঝালমুড়ি
বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম প্রধান অস্ত্র ছিল ‘বহিরাগত’ তত্ত্ব। বিজেপিকে উত্তর ভারতের একটি দল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে তৃণমূল। বলেছে, তারা বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বোঝে না। এমনকি বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাঙালিদের খাদ্যাভ্যাসে হস্তক্ষেপ করবে বলেও বারবার অভিযোগ তোলা হয়।
এবারের নির্বাচনের প্রচারে বিজেপি এই বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেয়। ভোটারদের আশ্বস্ত করতে বিজেপির অনেক নেতাকে প্রকাশ্যে মাছ খেতে দেখা গেছে। এছাড়া, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গ সফর করেন। তিনি কলকাতার ৩০০ বছরের পুরনো ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি মন্দির পরিদর্শনে যান। প্রসাদ হিসেবে আমিষ দেওয়ার জন্য এই মন্দিরটির বিশেষ ঐতিহ্য আছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর এই মন্দির পরিদর্শনকে বিজেপি রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগিয়েছে।
এছাড়া, নরেন্দ্র মোদির ঝালমুড়ি খাওয়ার ঘটনাটিও সামাজিক মাধ্যমে ইতিবাচক-নেতিবাচক আলোচনার ঝড় তুলেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বার্তা ঠিকই ভোটারের কাছে পৌঁছে গেছে। বিজেপি বার্তা দিয়েছে, বাঙালিদের খাবার নিয়ে খবরদারি করার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
