নার্গিস মোহাম্মাদি
ইরানের কারাগারের নীরব দেয়ালের ভেতর যেন ধুঁকে ধুঁকে নিভে যেতে বসেছে এক প্রতিবাদী কণ্ঠ। মানবাধিকার আন্দোলনের সাহসী মুখ এবং ২০২৩ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নার্গিস মোহাম্মাদি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে অবশেষে কারাগার থেকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
তার প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশন জানায়, শুক্রবার কারাগারের ভেতর দু’দফা জ্ঞান হারান তিনি। হৃদরোগজনিত জটিলতায় তার শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে—যেন প্রতিটি শ্বাস হয়ে উঠছিল এক একটি লড়াই। পরিস্থিতি এতটাই সংকটজনক হয়ে ওঠে যে কারাগারের চিকিৎসকরাও স্বীকার করেন, এই অবস্থা আর সেখানে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।
ফাউন্ডেশনের বিবৃতিতে বলা হয়, আগে থেকেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসার সুপারিশ থাকলেও তা উপেক্ষিত হয়েছিল। অবশেষে চরম অবস্থার মুখে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়—একটি দেরিতে আসা সিদ্ধান্ত, যা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
উত্তর-পশ্চিম ইরানের জানজান কারাগারের নিঃসঙ্গ অন্ধকারে শুক্রবারই দু’বার অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি। তার আইনজীবীরা জানান, গত মার্চের শেষ দিকে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন—তারপর থেকেই যেন শরীর আর মনের লড়াই চলছিল সমান্তরালে।
৫৩ বছর বয়সী এই সাহসী নারীকে গত ১২ ডিসেম্বর মাশহাদ শহর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে সাত বছরেরও বেশি কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যার বড় অংশই “রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার” অভিযোগে।
তবে তার পরিবারের ভাষ্য আরও বেদনাদায়ক—গ্রেপ্তারের সময় তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়েছিল। শরীরের পাশ, মাথা ও ঘাড়ে আঘাতের সেই স্মৃতি যেন আজও তার শরীরে বহন করছে ক্ষতচিহ্ন হয়ে।
এদিকে নোবেল কমিটি ইতোমধ্যে তার ওপর ‘চলমান জীবনহানিকর নির্যাতনের’ তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। যদিও ইরান সরকার এখনো এসব অভিযোগ নিয়ে নীরব।
গ্রেপ্তারের আগেও তিনি দীর্ঘ ১৩ বছর ৯ মাসের কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা ও নিরাপত্তাবিরোধী অভিযোগে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে চিকিৎসাজনিত কারণে সাময়িক মুক্তি পেলেও, স্বাধীনতার সেই ক্ষণিক আলো আবার মিলিয়ে যায় কারাগারের অন্ধকারে।
আজ তার জীবন যেন এক অনিশ্চিত প্রান্তে দাঁড়িয়ে—যেখানে প্রতিটি হৃদস্পন্দন শুধু বেঁচে থাকার নয়, বরং স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের জন্য এক নিঃশব্দ আর্তনাদ।
সোর্স:আল জাজিরা
