বস্তিকেন্দ্রিক মাদক নেটওয়ার্কে নারীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ—কারও বিরুদ্ধে একাধিক মামলা, কারও সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন। ছবি সংগৃহীত
রাজধানীর কাছাকাছি অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা—সব মিলিয়ে গাজীপুরের টঙ্গী দীর্ঘদিন ধরেই মাদক কারবারিদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা হিসেবে পরিচিত। টঙ্গীর হাজীর মাজার, ব্যাংক মাঠ, কেরানীরটেক, এরশাদ নগরসহ বিভিন্ন বস্তিতে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। সময়ের সঙ্গে এসব এলাকায় মাদক কারবারের ধরন যেমন বদলেছে, তেমনি এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে নারীদের একটি অংশের সম্পৃক্ততার অভিযোগও সামনে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এসব এলাকায় ছোট-বড় মাদক কারবারিদের পাশাপাশি নারীদের একটি অংশও সক্রিয়। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মাদক বিক্রির নেটওয়ার্ক। পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে স্থানীয় আরও অনেক নারী-পুরুষ তাঁদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ব্যাংক মাঠে মোমেলা বেগমের ‘নেটওয়ার্ক’
টঙ্গীর ব্যাংক মাঠ বস্তির বাসিন্দা মোমেলা বেগমকে বড় মাদক কারবারিদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। গাঁজা দিয়ে শুরু করে পরবর্তী সময়ে ফেনসিডিল, হেরোইন ও ইয়াবার কারবারে যুক্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
মোমেলা বেগমের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকায় তাঁর এবং পরিবারের সদস্যদের নামে বাড়ি, জমি ও যানবাহন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের ২ নভেম্বর ইয়াবা ও হেরোইনসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
ময়না খাতুনের ঘিরে পরিবারের সদস্যদের নাম
ব্যাংক মাঠ বস্তির আরেক আলোচিত নারী মাদক কারবারি হিসেবে স্থানীয়ভাবে পরিচিত ময়না খাতুন। তাঁর বিরুদ্ধেও একাধিক মাদক মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ময়না খাতুনের পরিবারের কয়েকজন সদস্যও মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। তাঁর মেয়ে নার্গিস ও পুত্রবধূ রোজীর বিরুদ্ধেও মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে।
ময়নার ভাই শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধেও ইয়াবা পরিবহনের অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে জানা গেছে। ময়নার ছেলে তাজুল ইসলাম তাজুর বিরুদ্ধেও মাদকসংক্রান্ত মামলা রয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে মাদক কারবার থেকে অর্জিত অর্থে গাজীপুর ও মাদারীপুরে সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও উঠেছে তাঁদের বিরুদ্ধে।
‘বড় আপা’ আফরিনার মাদক কারবার
টঙ্গীর ব্যাংক মাঠ বস্তিতে ‘বড় আপা’ নামে পরিচিত আফরিনা আক্তারকেও স্থানীয়ভাবে বড় মাদক কারবারি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে আগে ফেনসিডিলের পাইকারি কারবার এবং বর্তমানে ইয়াবা বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, এই কারবারে আফরিনা আক্তারকে তাঁর স্বামী ও ভাই সহযোগিতা করেন। অভিযোগ রয়েছে, সময়ের সঙ্গে মাদক কারবারের ধরন পরিবর্তন করলেও তাঁর নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে।
কেরানীরটেকে কুলসুম, বোন নার্গিস গ্রেপ্তার
কেরানীরটেক বস্তিতে সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে কুলসুমের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় আর্থিকভাবে অসচ্ছল থাকলেও মাদক কারবারের মাধ্যমে কয়েক বছরে তাঁর সম্পদ ও জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এসেছে।
কুলসুমের বিরুদ্ধে রেলওয়ের জায়গা দখল করে মাদক বিক্রির স্থান তৈরির অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি তাঁর বোন নার্গিসকে গাঁজাসহ গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ।
একই এলাকার আরেক নারী কারবারি হিসেবে কারিমা বেগমের নামও স্থানীয়ভাবে উঠে এসেছে। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
দীর্ঘদিনের মাদক কারবারের মাধ্যমে কারিমা বেগম বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে স্থানীয়দের।
টঙ্গীর বাইরে কাশিমপুর-লক্ষ্মীপুরাতেও নারীদের তৎপরতার অভিযোগ
শুধু টঙ্গীর বস্তিগুলোতেই নয়, গাজীপুর মহানগরের কাশিমপুর ও লক্ষ্মীপুরা এলাকাতেও নারী মাদক কারবারিদের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।
কাশিমপুরের নয়াপাড়া এলাকার ডালিয়া বেগমের জীবনযাত্রায় কয়েক বছরের ব্যবধানে বড় পরিবর্তন এসেছে বলে স্থানীয়রা জানান। তাঁদের দাবি, একসময় অন্যের বাড়িতে কাজ করলেও বর্তমানে ওই এলাকায় ডালিয়া বেগমের পরিবারের একাধিক বাড়ি রয়েছে।
লক্ষ্মীপুরা এলাকার তাহমিনা ও আশাকেও স্থানীয়ভাবে মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধেও মাদক ব্যবসার মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।
একা নন, পেছনে রয়েছে নেটওয়ার্ক
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এসব নারী একা নন; তাঁদের ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে আরও অনেক নারী ও পুরুষ কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কেউ মাদক সংগ্রহ করেন, কেউ পরিবহন করেন, আবার কেউ খুচরা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত।
স্থানীয়দের মতে, বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নারীদের ব্যবহার করে মাদক পরিবহন ও বিক্রির কৌশল নিচ্ছে কিছু চক্র। ফলে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি এসব নেটওয়ার্কের মূল হোতাদের শনাক্ত করা জরুরি।
অভিযান চলছে, তবু প্রশ্ন মাদকের অর্থের উৎস নিয়ে
গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. বেলায়াত হোসেন বলেন, মহানগরের বিভিন্ন বস্তিতে মাদক কারবার বন্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। গত আট মাসে এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার এবং অনেক কারবারিকে আটক করা হয়েছে।
তিনি জানান, সম্প্রতি কিছু বস্তিতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সহায়তায় কয়েকটি মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ করে সরকারি জমি উদ্ধার করা হয়েছে। টঙ্গীকে মাদকমুক্ত করতে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন বস্তিতে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই মাদকের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাদকের সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি কারবারের অর্থের উৎস, পৃষ্ঠপোষকতা এবং সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বিশেষ করে মাদক কারবারের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের যেসব অভিযোগ উঠছে, সেসব সম্পদের উৎস কী—তা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে প্রতিবেদনে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।
