শনিবার, ১৩ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাই কি অপরাধ? দক্ষিণ বনশ্রীতে সাংবাদিক এম এম তোহাকে খুন ও লাশ গুমের হুমকির অভিযোগ, আদালতে মামলা

স্টাফ রিপোর্টার
জুন ১২, ২০২৬ ৪:৩২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার মূল্য কি জীবন দিয়ে দিতে হবে? রাজধানীর দক্ষিণ বনশ্রীর একটি আবাসিক ভবনকে কেন্দ্র করে ওঠা এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এখন সেই প্রশ্নই সামনে নিয়ে এসেছে।

সাংবাদিক এম এম তোহা দাবি করেছেন, ভবনে কথিত মাদক ব্যবসা ও মাদকসেবীদের আড্ডার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ জানানোয় তাকে হত্যা করে লাশ গুম করার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় আদালতে মামলা দায়ের করা হলে আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সমন জারি করেছেন।

ঘটনাটি শুধু একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তার বিষয় নয়; বরং অপরাধ, মাদক ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে কথা বলা নাগরিকদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত—সেই প্রশ্নও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ মে ২০২৬ রাত প্রায় ১১টা ৪৫ মিনিটে পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে বাসায় ফিরছিলেন সাংবাদিক এম এম তোহা। দক্ষিণ বনশ্রীর ই-ব্লকের ৮/২ রোডের ২৬ নম্বর বাড়ির চারতলা থেকে পাঁচতলায় ওঠার সময় বাড়ির মালিক গোলাম মোস্তফা ও তার সহযোগীরা তার পথরোধ করেন বলে অভিযোগ।

সাংবাদিক তোহার দাবি, তাকে পরদিনের মধ্যে বাসা ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কারণ জানতে চাইলে তাকে বলা হয়, ভবনে কী ধরনের কার্যক্রম চলবে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার তার নেই। একপর্যায়ে তাকে খুন করে লাশ গুম করে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ভবনের কথিত মাদক ব্যবসার বিষয়ে অভিযোগ করাই ছিল এই বিরোধের মূল কারণ।

থানায় জিডি, পরে আদালতে মামলা

ঘটনার পরদিন ২৭ মে ২০২৬ তারিখে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে খিলগাঁও থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-২৫৮৩) করেন সাংবাদিক এম এম তোহা।

এরপর ৩ জুন ২০২৬ ঢাকার সিএমএম আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। মামলার নম্বর সি আর-৩৩০/২৬। আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে বাড়ির মালিক গোলাম মোস্তফা (৪৮) এবং ম্যানেজার নাঈম ওরফে নায়েবের বিরুদ্ধে সমন জারি করেছেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগের পেছনে দীর্ঘ এক ইতিহাস

অভিযোগকারীর দাবি, এটি কোনো আকস্মিক বিরোধ নয়।তার ভাষ্যমতে, ২০২৫ সাল থেকেই তিনি ভবনটিতে কথিত মাদক ব্যবসা, মাদকসেবীদের আনাগোনা এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলার বিষয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ জানিয়ে আসছিলেন।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ভবনের ছাদে নিয়মিত মাদকসেবীদের আড্ডা বসত। গভীর রাত পর্যন্ত চলত তাদের আনাগোনা। এতে ভবনের অন্যান্য বাসিন্দারাও আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করতেন।

সাংবাদিক তোহার পরিবারের অভিযোগ, মাদকসেবীরা মাঝরাতে বাসার দরজায় লাথি মারত, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করত এবং পুরো পরিবেশকে অস্থির করে তুলত।

ইভটিজিং ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ

শুধু মাদক নয়, সাংবাদিক তোহার স্ত্রীর পক্ষ থেকেও একাধিকবার হয়রানির অভিযোগ করা হয়েছে বলে জানা যায়।

২০২৫ সালের ২১ আগস্ট ডিএমপি কমিশনারের কাছে এবং ২৪ সেপ্টেম্বর খিলগাঁও থানার ওসির কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়। সেখানে ইভটিজিং ও নিরাপত্তাহীনতার বিষয় তুলে ধরা হয়েছিল।

পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল ডিএমপি কমিশনার এবং ৩ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছেও পৃথক অভিযোগ দেওয়া হয়। এসব অভিযোগে মাদকসেবীদের দ্বারা হয়রানি, ইভটিজিং এবং নিরাপত্তা সংকটের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছেও আবেদন

অভিযোগকারীর দাবি, সর্বশেষ ২৬ এপ্রিল ২০২৬ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছেও একটি আবেদন পাঠানো হয়।

সেখানে ভবনে কথিত মাদক ব্যবসা বন্ধ, মাদকসেবীদের আড্ডা উচ্ছেদ এবং সাধারণ বাসিন্দাদের নিরাপদে বসবাসের পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

পুরনো মাদক মামলার তথ্য

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট একই ভবন থেকে গাঁজা ও ১৪০ পিস ইয়াবাসহ শাহেদ (৪২) আরও দুই যুবক কে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গ্রেপ্তার করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় খিলগাঁও থানায় পৃথক দুটি  মাদক মামলাও দায়ের হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

বাড়িওয়ালার বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে বাড়ির মালিক গোলাম মোস্তফা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি বনশ্রী বাড়ির মালিক সমিতির কাছে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার চেয়ে আবেদন করেছেন এবং তাদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন।

তার দাবি, বিষয়টির সঙ্গে ভাড়া সংক্রান্ত বিরোধও জড়িত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভাড়াটিয়া বাসাটি পছন্দ না করলে অন্যত্র চলে যেতে পারেন।

অন্যদিকে সাংবাদিক এম এম তোহার বক্তব্য, প্রকৃত সমস্যা ভাড়া নয়; বরং মাদকবিরোধী অবস্থানের কারণেই তিনি ও তার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

ঘটনার সত্যতা নির্ধারণ করবে আদালত ও তদন্তকারী সংস্থা। তবে ঘটনাটি সমাজের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে—

মাদকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে কেন একজন নাগরিককে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে?

একাধিক প্রশাসনিক দপ্তরে অভিযোগ করার পরও কেন সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না?

একজন সাংবাদিক যদি নিজের জীবন নিয়ে আতঙ্কে থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী?

মাদক, সন্ত্রাস ও সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলা কি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে?

রাষ্ট্রের করণীয়

মাদক আজ দেশের অন্যতম বড় সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাবে ধ্বংস হচ্ছে পরিবার, বিপথে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্ম এবং বাড়ছে নানা ধরনের অপরাধ।

এমন পরিস্থিতিতে মাদকবিরোধী অবস্থান গ্রহণকারী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অভিযোগ সত্য হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আর অভিযোগ অসত্য হলে সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করতে হবে।

কারণ, সত্য উদঘাটনই হতে হবে বিচারপ্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য। দক্ষিণ বনশ্রীর ঘটনাটি বর্তমানে আদালতের বিচারাধীন। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার আদালতের।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলা কোনো অপরাধ নয়। একজন নাগরিক, একজন সাংবাদিক কিংবা একজন পরিবারের সদস্য যদি সমাজের স্বার্থে অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, তাহলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের দায়িত্ব।

কারণ, মাদকের বিরুদ্ধে নীরবতা অপরাধীদের শক্তিশালী করে, আর প্রতিবাদই একটি সুস্থ ও নিরাপদ সমাজ গঠনের প্রথম শর্ত।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।