বুধবার, ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মামলায় পরোয়ানা জারি থাকলেও অফিস করছেন বিআরটিএর সহকারী পরিচালক আলতাব হোসেন

নিজস্ব প্রতিবেদক
সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬ ৮:৩৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মামলা, সম্পত্তি ক্রোক, গ্রেফতারি পরোয়ানা—তবুও বহাল তবিয়তে পাবনায়। দুদকের অনুসন্ধানে ১৭ স্থানে জমি-প্লট-বাড়ির সন্ধান। অবৈধ সম্পদ ও তথ্য গোপনের অভিযোগ। ফাইল ফটো

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) একজন সহকারী পরিচালক মো. আলতাব হোসেন। পদটি খুব বড় নয়। অথচ তার বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা যেন সীমাহীন। দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা হয়েছে। মামলায় চার্জশিটও হয়েছে। আদালতের আদেশে তার ও তার স্ত্রীর সম্পত্তি ক্রোক করা হয়েছে। সর্বশেষ তার বিরুদ্ধে জারি হয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানাও।

তারপরও তিনি বহাল তবিয়তে। শুধু চাকরিতেই বহাল নন, গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়েই নিয়মিত অফিস করছেন বিআরটিএর পাবনা কার্যালয়ে। প্রশ্ন উঠেছে—মামলা, সম্পত্তি ক্রোক ও গ্রেফতারি পরোয়ানার পরও কীভাবে একজন সরকারি কর্মকর্তা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন?

আলতাব হোসেনের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধানে ঢাকা ও ফরিদপুরে ১৭টি স্থানে জমি, প্লট ও বাড়ির সন্ধান পাওয়ার কথা মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নামে-বেনামে এসব সম্পদ গড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে বিপুল অর্থ রাখা হয়েছে এবং বিদেশেও অর্থ পাচার করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলোর স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

প্রায় চার বছর আগে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আলতাব হোসেনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপনের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানায় সংস্থাটি।

সাড়ে তিন কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ

২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ সংস্থাটির উপপরিচালক মো. আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে আলতাব হোসেন ও তার স্ত্রী মোছা. জিয়াসমীন আরার বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের করেন।

প্রথম মামলার এজাহারে বলা হয়, আলতাব হোসেন দুদকে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ১ কোটি ১৭ লাখ ৪৯ হাজার ২৮৩ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য গোপন করে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য দিয়েছেন। একই সঙ্গে দুদকের অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ১ কোটি ১৪ লাখ ৭২ হাজার ৯৩ টাকার সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে দ্বিতীয় মামলায় তার স্ত্রী মোছা. জিয়াসমীন আরাকে প্রধান আসামি এবং আলতাব হোসেনকে সহযোগী আসামি করা হয়। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, জিয়াসমীন তার সম্পদ বিবরণীতে ১ কোটি ৬৬ লাখ ৬৪ হাজার ৯৯৯ টাকার সম্পদের বিষয়ে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য দেন। অনুসন্ধানে তার নামে ২ কোটি ৪২ লাখ ২ হাজার ২৫১ টাকার অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে দুদক।

দুদকের অভিযোগ, গৃহিণী হিসেবে জিয়াসমীনের নামে থাকা এসব সম্পদের সঙ্গে তার বৈধ আয়ের সামঞ্জস্য নেই। এসব সম্পদ তার স্বামী আলতাব হোসেনের দুর্নীতির অর্থে গড়ে উঠেছে—এমন অভিযোগের ভিত্তিতেই তাকে সহযোগী আসামি করা হয়েছে। মামলায় দুজনের বিরুদ্ধে দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

১৭ স্থানে সম্পত্তির সন্ধান

দুদকের অনুসন্ধানে আলতাব হোসেন ও তার স্ত্রী জিয়াসমীন আরার নামে ঢাকা ও ফরিদপুরে মোট ১৭টি স্থানে জমি, প্লট ও বাড়ির সন্ধান পাওয়ার কথা মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। সন্তানদের নামে থাকা সম্পত্তির তথ্য এই হিসাবের মধ্যে আসেনি।

আলতাব হোসেনের নামে ফরিদপুরে ১২টি স্থানে জমি রয়েছে। কাগজপত্রে এসব সম্পত্তির মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৩৫ লাখ টাকা। তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত বাজারমূল্য এর চেয়ে অনেক বেশি।

সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে থাকা তার প্লট ও বাড়ির মূল্য নিয়ে। কাগজপত্রে গুলশানের ওই প্লট ও বাড়ির মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান বাজারদরে ওই সম্পত্তির মূল্য এর চেয়ে বহুগুণ বেশি।

অন্যদিকে আলতাব হোসেনের স্ত্রী জিয়াসমীনের নামে ঢাকায় দুটি প্লট ও বাড়ির মূল্য দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। ফরিদপুরে তার নামে রয়েছে আরও দুটি প্লট ও জমি, যার মূল্য দেখানো হয়েছে ৩ লাখ টাকা।

দুদক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জিয়াসমীনের নামে থাকা এসব সম্পত্তির বর্তমান মূল্য অনেক বেশি। তবে দুদকের মামলায় সম্পত্তির প্রকৃত বাজারমূল্য উল্লেখ করা হয়নি; কাগজপত্রে ঘোষিত মূল্যই মামলার হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

চার্জশিটের পর সম্পত্তি ক্রোক

দুই মামলায় পরবর্তী সময়ে চার্জশিট দাখিল করা হয়। একপর্যায়ে আদালত আলতাব হোসেন ও তার স্ত্রীর সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেন।

২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর ঢাকা মহানগর সিনিয়র বিশেষ জজ সাব্বির ফায়েজের আদালত দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আদেশ দেন। আদালত বিআরটিএর সহকারী পরিচালক মো. আলতাব হোসেন ও তার স্ত্রী জিয়াসমীন আরার ১৭টি স্থানে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেন।

তবে অভিযোগ রয়েছে, সন্তানদের নামে ক্রয় করা এবং আলতাব হোসেন ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন হলেও বেনামে ক্রয় করা সম্পত্তি ওই ক্রোক আদেশের বাইরে রয়েছে।

গ্রেফতারি পরোয়ানার পরও অফিস

মামলা ও সম্পত্তি ক্রোকের পর এবার আলতাব হোসেনের বিরুদ্ধে জারি হয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানা। চলতি বছরের ২০ এপ্রিল ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত তার বিরুদ্ধে এই পরোয়ানা জারি করেন।

পরোয়ানার কপি আলতাব হোসেনের কর্মস্থল পাবনার পুলিশ সুপার এবং তার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ মে আলতাব হোসেনের বিরুদ্ধে জারি হওয়া গ্রেফতারি পরোয়ানাটি পাবনার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে রিসিভ করা হয়েছে।

কিন্তু এরপরও বদলায়নি তার কর্মজীবনের বাস্তবতা। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পরও তিনি বিআরটিএর পাবনা কার্যালয়ে নিয়মিত অফিস করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে—পুলিশের কাছে গ্রেফতারি পরোয়ানা পৌঁছানোর পরও কেন তাকে গ্রেফতার করা হয়নি? আর আদালতের পরোয়ানার বিষয়টি জানার পরও বিআরটিএ কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কেন তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়নি?

নিয়ম কোথায়, প্রয়োগ কোথায়?

সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান থাকলেও আলতাব হোসেনের ক্ষেত্রে তা কার্যকর হয়নি—এমন অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা, চার্জশিট, সম্পত্তি ক্রোকের আদালতের আদেশ এবং সর্বশেষ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পরও তিনি কীভাবে একই পদে বহাল থেকে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন?

এমনকি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরও পাবনা শহরে প্রকাশ্যে নিয়মিত অফিস করার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

চেয়ারম্যানের বক্তব্য মেলেনি

মামলা, সম্পত্তি ক্রোক এবং আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানার পরও বিআরটিএর সহকারী পরিচালক আলতাব হোসেনের বিরুদ্ধে কেন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এ বিষয়ে জানতে বিআরটিএর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।

তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে বিষয়টি জানতে চাওয়া হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—দুদকের মামলায় অভিযুক্ত, আদালতের আদেশে সম্পত্তি ক্রোক হওয়া এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি থাকা একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে এখনো বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন?

মামলা ও আদালতের আদেশের পরও যদি প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারি সংস্থাগুলোর জবাবদিহি ও কার্যকর পদক্ষেপের প্রশ্নটিই সামনে আসে।

উল্লেখ্য যে, মামলা, গ্রেফতার এড়িয়ে অফিসে দায়িত্ব পালন,সব কিছু ম্যানেজ? তাহলে আদালতের আদেশের চেয়ে আইনের হাত লম্বা? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে নেটিজেনরা। বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে………..

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।