সানজি গ্রুপের হিসাব বিভাগের কর্মকর্তা পার্থ সারথী হালদার গ্রেপ্তার, তদন্তে চেক জালিয়াতি ও ভুয়া খতিয়ানের তথ্য। প্রতীকী ছবি
যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি, সেই প্রতিষ্ঠানেরই কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে সানজি গ্রুপ অব কোম্পানির অর্থ ও হিসাব বিভাগের সহকারী মহাব্যবস্থাপক পার্থ সারথী হালদারের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটির ১৬ কোটি ৬২ লাখ ৪১ হাজার ২১৫ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সোমবার রাত সোয়া ১টার দিকে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজার এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সিআইডির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকা অবস্থায় অন্যদের সঙ্গে যোগসাজশ করে বিভিন্ন কৌশলে কোম্পানির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে পার্থ সারথী হালদারের বিরুদ্ধে। মামলার এজাহার ও তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, মালিকের স্বাক্ষর করা খালি চেকের প্রাপকের নাম পরিবর্তন করে অভিযুক্তরা নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর করতেন। পাশাপাশি গ্রাহকদের কাছ থেকে নগদ অর্থ সংগ্রহ করে তা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা না দেওয়া এবং ব্যাংক ট্রান্সফার ও রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্টের (আরটিজিএস) মাধ্যমে ব্যক্তিগত হিসাবে টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সফটওয়্যারে ভুয়া খতিয়ান, ব্যাংক হিসাবে নেই টাকার জমা
অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের হিসাব ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যারে ভুয়া খতিয়ান তৈরি করে গ্রাহকদের অর্থ জমা দেখানো হতো। কিন্তু ব্যাংক বিবরণী ও গ্রাহকভিত্তিক হিসাব পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট অর্থ কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে জমা না হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
এসব ঘটনায় ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর ভাটারা থানায় মামলা করে সানজি গ্রুপ। মামলাটির তদন্তে নেমে সিআইডি পার্থ সারথী হালদারের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ জমা ও স্থানান্তরের মাধ্যমে ২ কোটি ২৭ লাখ ২২ হাজার ৮৯৭ টাকা আত্মসাতের অভিযোগের তথ্য পায়।
এ ছাড়া নগদ অর্থের হিসাব সমন্বয়, সফটওয়্যারে ভুয়া খতিয়ান তৈরি এবং অন্য একটি ব্যাংকের দুটি হিসাব ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।
চেক জালিয়াতিতে একাই ৯ কোটি ৫৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
সিআইডির তদন্তে আরও উঠে এসেছে, চেক জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে পার্থ সারথী হালদার একাই বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৯ কোটি ৫৩ লাখ ২৫ হাজার ৮৩৯ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, অন্য অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগসাজশে গ্রাহকদের কাছ থেকে নগদ অর্থ ও খালি চেক সংগ্রহ করা হতো। পরে চেকে নিজেদের পছন্দমতো প্রাপকের নাম বসিয়ে টাকা উত্তোলন ও স্থানান্তরের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করা হতো বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এদিকে সানজি গ্রুপের আরেক প্রতিষ্ঠান পানামা সিএনজি কনভার্সন থেকেও একই কৌশলে ৬৫ লাখ ৭ হাজার ৯৫০ টাকা আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে সিআইডি।
সব মিলিয়ে সানজি গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ১৬ কোটি ৬২ লাখ ৪১ হাজার ২১৫ টাকার অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে আত্মসাতের অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, প্রতিটি লেনদেনের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হবে।
জিজ্ঞাসাবাদে সম্পৃক্ততা স্বীকারের দাবি সিআইডির
সিআইডি জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পার্থ সারথী হালদার অপরাধে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অর্থ আত্মসাতের পুরো ঘটনা, এর সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের পরিচয় এবং অর্থের লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য জানতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এর আগে গ্রেপ্তার আরও দুই আসামি
এ মামলায় এর আগে গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শান্তিনগর মোড় থেকে সাইফুল ইসলাম ওরফে জনি এবং সৈয়দ আরব আলী নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে তাঁদের সংশ্লিষ্টতাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ হিসাব ব্যবস্থাপনা, ব্যাংক লেনদেন, চেক ব্যবহারের প্রক্রিয়া এবং সফটওয়্যারে হিসাব সংরক্ষণের পদ্ধতি—সব মিলিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ চিত্র উদ্ঘাটনে তদন্ত চালাচ্ছে সিআইডি।
