নওগাঁ প্রতিনিধি:সরকারি অর্থায়নে দক্ষ চালক তৈরির মহৎ উদ্যোগ যেন পরিণত হয়েছে ঘুষ ও অনিয়মের এক বিতর্কিত কারখানায়। নওগাঁ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি)-এ পরিচালিত মোটর ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কোর্সে বিআরটিএ পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেওয়ার আশ্বাসে প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, চার মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য ভাতাও না দেওয়ার অভিযোগে ক্ষোভে ফুঁসছেন ভুক্তভোগীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘সিসেক’ প্রকল্পের আওতায় নওগাঁ টিটিসিতে দুটি ব্যাচে মোট ৪৯ জন শিক্ষার্থীকে চার মাসের মোটর ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। গত ২৯ ডিসেম্বর নওগাঁ বিআরটিএ কার্যালয় এসব প্রশিক্ষণার্থীর চূড়ান্ত পরীক্ষা গ্রহণ করে।
তবে অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পরীক্ষার আগের দিন ঘটে যাওয়া এক বিতর্কিত ঘটনা। প্রশিক্ষণার্থীদের দাবি, ২৮ ডিসেম্বর সিসেক প্রকল্পের দুই প্রশিক্ষক ওয়ালিউল্লাহ সানি ও মাহবুব আলম নয়ন তাদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন—মাথাপিছু ২ হাজার টাকা না দিলে বিআরটিএ পরীক্ষায় পাশ করা কঠিন হবে। এরপর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোট প্রায় এক লাখ টাকা আদায় করা হয়।
প্রশিক্ষণার্থী নুরন্নবী, হাবিবুর রহমান ও রবিউল ইসলামসহ একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, আমাদের বলা হয়েছিল টাকা না দিলে কেউ পাশ করতে পারবে না। প্রশিক্ষণ ভাতা তো দূরের কথা, উল্টো আমাদের কাছ থেকে ভয় দেখিয়ে টাকা নেওয়া হয়েছে। এটি আমাদের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা ও জুলুম।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, অভিযুক্ত দুই প্রশিক্ষক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেননি। বরং তারা দাবি করেছেন, এই অর্থ তারা নিজেদের জন্য নেননি।
প্রশিক্ষক মাহবুব আলম নয়ন বলেন, বিআরটিএ কর্মকর্তাদের চাহিদা অনুযায়ী আমরা বাধ্য হয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেছি। টাকা না দিলে তারা বিভিন্ন অজুহাতে পরীক্ষার্থীদের ফেল করিয়ে দেয়।
এই বক্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে— যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে সরকারি লাইসেন্সিং ব্যবস্থার ভেতরে কি দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ঘুষ-সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টিটিসির এক কর্মচারী আরও বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে বলেন, এই ঘুষের টাকার ভাগ বিআরটিএ’র মোটরযান পরিদর্শক থেকে শুরু করে প্রশাসনের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে থাকে। একটি শক্তিশালী চক্র পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করে বলেও দাবি করেন তিনি।
যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নওগাঁ বিআরটিএ’র মোটরযান পরিদর্শক শরিফুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অপরদিকে বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক রাসেদুজ্জামান বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেওয়া সম্ভব নয়।
অন্যদিকে টিটিসি নওগাঁর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান বলেন, সরকারি এই প্রশিক্ষণে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়ার বিধান নেই। অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারাও।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) নওগাঁ জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট মহসীন রেজা বলেন, ঘুষের বিনিময়ে অদক্ষ চালকদের লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়া মানে দেশের সড়ক নিরাপত্তাকে মৃত্যুফাঁদে ঠেলে দেওয়া। এটি শুধু দুর্নীতি নয়, একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।
একুশে পরিষদের সভাপতি ডিএম আব্দুল বারী বলেন, দক্ষ জনশক্তি তৈরির সরকারি প্রকল্প যদি ঘুষ বাণিজ্যের আখড়ায় পরিণত হয়, তাহলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। দ্রুত স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রশিক্ষণ প্রকল্পে যদি পরীক্ষায় পাশের জন্য ‘অতিরিক্ত ফি’ দিতে হয়, তবে দক্ষতা মূল্যায়নের মানদণ্ড কোথায়? আর যদি ঘুষ ছাড়া লাইসেন্স পাওয়া না যায়— তবে সড়কে চলা হাজারো যানবাহনের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?
এখন দেখার বিষয়, অভিযোগগুলো কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রকৃত তদন্তের মাধ্যমে এই অভিযোগের সত্যতা উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
