রবিবার, ১৭ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

“২ হাজার কোটি টাকার বালু লুটের মহোৎসব”— বিআইডব্লিউটিএতে আওয়ামী আমলের ‘সিন্ডিকেট সাম্রাজ্য’ ঘিরে তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক
মে ১৬, ২০২৬ ৭:৫৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

নামমাত্র দামে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রির বিস্ফোরক অভিযোগ, দুদকের অনুসন্ধানে আতঙ্কে প্রভাবশালী চক্র। ফাইল ছবি সংগৃহীত

কক্সবাজারে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ ‘পানির দামে’ বিক্রির ভয়াবহ অভিযোগ ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী আমলে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী ‘বালু সিন্ডিকেট’ পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের মহোৎসবে মেতে ওঠে। আর সেই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিআইডব্লিউটিএ’র পরিচালক (বন্দর ও পরিবহন) এ. কে. এম. আরিফ উদ্দিন-সহ কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা।

ঘটনাটি এখন শুধু অনিয়ম নয়—বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের এক ভয়ংকর ‘ব্লু-প্রিন্ট’ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আওয়ামী আমলের প্রশাসনিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেট বছরের পর বছর ধরে নদী, বন্দর, ড্রেজিং ও ইজারা খাতে গড়ে তোলে এক অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতির সাম্রাজ্য।

“২ হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিক্রি মাত্র আড়াই কোটিতে!

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার সরকারি সম্পদ মাত্র ২ কোটি ৭৯ লাখ ৩৯ হাজার ৭৩৮ টাকায় ‘টোকিও মিল জেভি’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। বিশাল অঙ্কের এই রাষ্ট্রীয় সম্পদ অবিশ্বাস্য কম মূল্যে হস্তান্তরের ঘটনায় বিস্মিত তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও।

জানা গেছে, কক্সবাজার সদর উপজেলার এন্ডারসন রোড এলাকার বাসিন্দা আতিকুল ইসলাম (সিআইপি) গত ৪ মার্চ দুদকের প্রধান কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে পুরো বিষয়টি সামনে আসে। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই নড়েচড়ে বসে দুদক।

মাতারবাড়ি প্রকল্পকে বানানো হয় ‘লুটপাটের স্বর্গরাজ্য’

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মাতারবাড়ি বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মহেশখালী চ্যানেলের নুনিয়ার ছড়া থেকে আদিনাথ মন্দিরের উজান পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে প্রায় ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার ১৮২ ঘনফুট বালু ও মাটি উত্তোলন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই ড্রেজিং কার্যক্রমকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে ভয়ংকর কমিশন বাণিজ্য, টেন্ডার কারসাজি ও অবৈধ সম্পদ বেচাকেনার সিন্ডিকেট।

এখন বড় প্রশ্ন—এত বিপুল পরিমাণ সম্পদ উত্তোলনের অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হলো? জেলা প্রশাসনের অনুমতি আদৌ ছিল কি না, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে গভীর রহস্য। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র জব্দ ও যাচাই শুরু করেছে দুদক।

মোবাইল কোর্ট অভিযানে বেরিয়ে আসে ‘অন্ধকার সাম্রাজ্যের’ তথ্য

২০২৫ সালের ২ অক্টোবর পরিচালিত মোবাইল কোর্টের নথি, জব্দ তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ড সংগ্রহ করছে তদন্ত টিম। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই অভিযানে বেরিয়ে আসে কোটি কোটি টাকার ড্রেজড ম্যাটেরিয়াল বাণিজ্যের অন্তরালের ভয়ংকর চিত্র।

দুদক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি সম্পদ বিক্রির পুরো প্রক্রিয়ায় দরপত্র মূল্যায়ন, কার্যাদেশ প্রদান এবং চুক্তি সম্পাদনে ভয়াবহ অনিয়ম হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতেই পুরো প্রক্রিয়া সাজানো হয়েছিল।

আরিফ উদ্দিনকে ঘিরে বিস্তৃত দুর্নীতির জাল-

শুধু কক্সবাজার নয়, এ. কে. এম. আরিফ উদ্দিন-এর বিরুদ্ধে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর ঘিরেও রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। তুরাগ ও বুড়িগঙ্গা নদীতীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, নদীতীর ইজারা এবং রাজস্ব আদায়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, আওয়ামী আমলে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা এই কর্মকর্তা সিন্ডিকেট কার্যত বিআইডব্লিউটিএকে পরিণত করেছিল ‘দুর্নীতির অভয়ারণ্য’-এ। নদী, বন্দর, ড্রেজিং, ইজারা—সবখানেই ছিল কমিশন বাণিজ্যের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ।

দুদকের বিশেষ টিম মাঠে-

পুরো ঘটনার অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশন দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষ টিম গঠন করেছে। দুদকের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলামকে প্রধান এবং সহকারী পরিচালক সুভাষ চন্দ্র মজুমদারকে সদস্য করে গঠিত এ টিম ইতোমধ্যে নথিপত্র যাচাই-বাছাই শুরু করেছে।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার দাবিও জোরালো হচ্ছে।

আওয়ামী আমলের ‘দুর্নীতির ব্লু-প্রিন্ট’?

বিশ্লেষকদের মতে, বিআইডব্লিউটিএকে ঘিরে যে ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র সামনে আসছে, তা মূলত আওয়ামী আমলে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক দুর্নীতির একটি নগ্ন প্রতিচ্ছবি।

রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট, কমিশন বাণিজ্য, টেন্ডার কারসাজি, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে এটি ছিল এক ধরনের “প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট ব্যবস্থা”।

এখন জনমনে একটাই প্রশ্ন—রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ লুটের সঙ্গে জড়িত এই প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে আদৌ কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, নাকি আগের মতোই সবকিছু ধামাচাপা পড়ে যাবে? তবে সুষ্ঠু তদন্তের অগ্রগতি দেখতে প্রহর গুনছেন নেটিজেনরা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।