নিহত শিশু আতিকা। ছবি-সংগৃহীত
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার শান্ত সবুজ গ্রাম হাটিপাড়া—যেখানে সন্ধ্যার বাতাসে ভেসে আসে পাখির ডাক, সেই গ্রামই হঠাৎ রক্তাক্ত এক বিভীষিকায় স্তব্ধ হয়ে গেল। নিখোঁজ হওয়া আট বছরের নিষ্পাপ শিশু আতিকার নিথর দেহ উদ্ধার আর তার পরপরই ক্ষোভের আগুনে জ্বলে উঠে গণপিটুনিতে প্রাণ হারালেন দুই ভাই—এ যেন এক রাতেই বদলে যাওয়া জীবনের নির্মম গল্প।
বৃহস্পতিবার বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে দুদুল মিয়ার ছোট্ট মেয়ে আতিকা হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে যায়। সোনাঝরা শৈশবের সেই হাসিমুখ যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে যায় অজানার অন্ধকারে। পরিবারের আহাজারি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকুল আহ্বান আর মাইকিংয়ে ভেসে ওঠা নাম—সবকিছুই যেন হয়ে ওঠে এক মরিয়া খোঁজ।
কিন্তু রাত যত গভীর হয়, ততই ঘনীভূত হয় শঙ্কা। অবশেষে রাত ১০টার দিকে বাড়ির পাশের ভুট্টা ক্ষেতে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায় আতিকার নিথর দেহ। নিস্তব্ধ মাঠ যেন সাক্ষী হয়ে থাকে এক নির্মমতার—যেখানে থেমে গেছে এক নিষ্পাপ জীবনের গল্প। পরিবারের ধারণা, স্বর্ণের দুল ও গলার চেইনের লোভেই এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড।
এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই গ্রামজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া, আর সেই শোকই মুহূর্তে রূপ নেয় ক্ষোভের দাবানলে। সন্দেহভাজন হিসেবে স্থানীয়রা আটক করে বাবা-ছেলেসহ তিনজনকে। তারপর শুরু হয় বিক্ষুব্ধ জনতার নির্মম প্রতিশোধ—গণপিটুনিতে নিহত হন অটোচালক পান্নু মিয়া (৩৫) ও তার ভাই ফজলু (২৮)। গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের পরিবারেরই আরেক সদস্য নাজমুল (২০) এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। মানিকগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ইকরাম হোসেন জানান, নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে গণপিটুনির ঘটনাতেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিঃশব্দ রাতের আকাশে এখনো ভাসছে আতিকার অসমাপ্ত স্বপ্ন আর দুই পরিবারের হাহাকার। একদিকে শিশুহত্যার বেদনা, অন্যদিকে প্রতিশোধের নামে আরও দুই প্রাণের নিঃশেষ—মানিকগঞ্জের এই রাত যেন প্রশ্ন রেখে যায়, কোথায় থামবে এই নির্মমতার চক্র?
